বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্কুল শিক্ষা

1231

‘শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠী’- একুশ শতকের বিশ্ব প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে এই তিনটির কোন বিকল্প কি কেউ বলতে পারবেন?
স্বাধীনতা পরবর্তী চারটি দশক পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মাথাপিছু আয়, জীবীকার মানউন্নতির সূচক সকল ক্ষেত্রেই উর্ধ্বমুখী।

রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সরকারি আমলা থেকে শুরু করে নানা শ্রেণী-পেশার সকল শ্রমজীবী, সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রেখে নিশ্চিত করেছেন এই উন্নতি। আর এই উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখতে হবে সকলে মিলেই।

দেশের বর্তমান অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে  ব্যবসায়ী সমাজ, কর্পোরেট প্রতিনিধি এবং সরকারি চাকুরিজীবীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমানে কর্মক্ষম এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ তাদের স্কুল যাত্রা শুরু করেছিলেন ৭০ এবং ৮০ এর দশকে। সে হিসেবে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, আজকের স্কুলগামী শিক্ষার্থীরাই আজ থেকে পঁচিশ অথবা ত্রিশ বছর পরে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে কার্যকরী অবদান রাখবে। তারাই একুশ শতকের প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিবে।

সুতরাং আমাদের রাজনীতি, আমাদের শিক্ষানীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা- এ সকল বিষয় যেন শিক্ষাবান্ধব হয় এবং নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সর্বাত্মক সহায়ক হয়, একজন অভিভাবক হিসেবে এবং সর্বোপরি স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এটা আমার অধিকার।

চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরণের ভয়াবহ পরিণিত ডেকে আনতে পারে তার কয়েকটি তুলে ধরা যাক আপনাদের সামনে-

ছোট মাথায় বড়ো বোঝা : চলমান অবরোধের কারণে স্কুলগুলোতে ক্লাস হচ্ছে না। স্বাভাবিক কারণেই সিলেবাস সম্পন্ন করার নির্ধারিত সময়সীমা সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভাল ফলাফল করার তাগিদ অথবা চাপ কোনটাই কমবে না। স্বল্প সময়ে অধিক পড়া, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সম্মিলিতি চাপ; শিশুদের জন্য কখনোই সুদূরপ্রসারী সুফল বয়ে আনতে পারেনা।

মনস্তাত্ত্বিক চাপ : গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বুলেট আর বোমাবাজির মতো সহিংসতা কোমলমতি শিশুদের মনে স্থায়ী ভীতির সঞ্চার করছে। কখনো তারা এসব ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শী কখনোবা গনমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছে। চলমান সহিংসতা দেখতে দেখতে বড়ো হতে থাকা একটি শিশুকে কী পরিমান মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে তা অনুমান করতে মনোবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। শিশুর অপূরণীয় মনোদৈহিক ক্ষতি করছে এই চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা।

শঙ্কিত অভিভাবক : টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির প্রথমদিকে কিছু কিছু স্কুল ও সহায়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছিলো। তবে ফেণী ও চট্টগ্রামে দুই স্কুল শিক্ষার্থীর ওপর পিকেটারদের বোমা হামলা অভিভাবকদের সন্তানের নিরাপত্তা শঙ্কাকে আরো বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। স্কুলগুলো তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে আর অভিভাবক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সন্তানের ভবিষ্যত নিরাপত্তা নিয়ে।

হুমকির মুখে সৃষ্টিশীলতা : যে কোন শিক্ষার্থীর সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটে তার প্রচলিত পড়াশোনার বাইরের কার্যক্রমের মাধ্যমে। খেলাধুলা, ছবি অাঁকা, গান-নাচ শেখা এসবই এক্সট্রা কারিকুলাম-এর অংশ। এ ধরণের কার্যক্রম শুধু শিশুর সৃষ্টিশীল মনোবিকাশই ঘটায় না, শিক্ষার্থীদের নির্মল বিনোদনের উৎসও বটে। যেখানে চলমান রাজৈনতিক অস্থিরতা শিশুদের বাধ্য করছে দিনের পুরোটা সময় বাসায় বসে কাটাতে। শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল কার্যক্রমতো জীবন থেকে মুছে যাওয়ার না উপক্রম হয়, শঙ্কা এখন সেটাই।

রাজনৈতিক অবহেলা : প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলছে গত কয়দিনে তাদের কতো হাজার কোটি টাকা লােকসান গুনতে হয়েছে কিন্তু গত কয়দিনের ঘটনায় শিক্ষাবর্ষ বাধাগ্রস্থ হওয়ার কারণে দেশের কী পরিমান অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে এখেনা কোন সঠিক তথ্উপাত্ত তুলে ধরেনি কোন সংগঠন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলাের উদাসীনতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এ অবস্থা চলতে থাকেল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের রাজনীতিতে তাদের মেধা ব্যবহারে অনুৎসাহী তো হবেই, উল্টো চরম বিরূপ ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠবে।

হরতাল বা অবরোধ, সহিংস বা অহিংস আন্দোলন, সমাবেশ করা বা না করা এই সকল বিষয় নিয়ে আমরা কিছু বলতে চাই না। বর্তমান রাজনীতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অথবা এর সামগ্রিক পরিণতি পর্যালোচনা; আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। জাতীয় দৈনিক-এর কলাম আর টেলিভিশন টকশো এ সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখুক।

তবে রাজনৈতিক দল ও মতের উর্ধ্বে উঠে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, আমরা কি অন্তত একটি বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারিনা, নতুন প্রজন্ম তথা আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারিদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক অগ্রগতির জন্য কখনো যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আমাদের এই প্রত্যাশা কি খুব বেশি কিছু?

Champs21.com বাংলাদেশের স্কুলগামী শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ এবং অভিভাবকদের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ওয়েব পোর্টাল হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ববোধ থেকে একটি সিরিজ মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের শিক্ষাবর্ষ যে ভয়াবহ সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে, এর প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে সে বিষয় নিয়ে Champs21.com কথা বলেছে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের সঙ্গে।

সুপ্রিয় পাঠক, আমাদের সাথে থাকুন আগামী কয়েকটা দিন, ধারাবাহিকভাবে আমরা এই সাক্ষাৎকারগুলো আপনাদের সামনে নিয়ে আসছি।

লেখক : রাসেল টি আহমেদ
প্রতিষ্ঠাতা, Champs21.com
russell.ahmed@champs21.com