আমাকে স্কুলে যেতে দাও

হরতাল অবরোধে তো এখন কোনো নিরাপত্তা নেই। সেহেতু আমি একটা বাচ্চাকে আমার স্কুলে ডেকে পাঠাবো কী করে। পথে যদি তার কোনো অঘটন ঘটে যায়  তার দায়িত্বটা কে নেবে? কিছু হলে অভিভাবকেরা আমাকেই দায়ী করবেন। যে কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা সাধন করা রাষ্ট্রের ব্যাপার।

আমাদের স্কুলে যেহেতু পুরো বছরের একটা ক্যালেন্ডার থাকে। সে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আমাদের কারিকুলাম, সিলেবাস ঠিক করা থাকে। সে কারণে এখন স্কুল বন্ধ থাকায় আমরা খানিকটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছি।

আমরা হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা খুব ভালোভাবে শেষ করেছি। আমাদের পরবর্তী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। সে কারণে আমরা একটু চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন বর্তমানে।

তবে যতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই পড়ি না কেন। আমরা কিন্তু চেষ্টা করছি সে চ্যালেঞ্জ মেনে নিয়েই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য। আমাদের সে সমস্ত শিক্ষার্থী এ লেভেল ও লেভেল পরীক্ষা দেবে তাদের রেজিষ্ট্রেশন প্রক্রিয়াটা এর মধ্যেও আমরা চালু রেখেছি। তবে সেটা অভিভাবকদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই।

এখন যেহেতু ক্লাসরুম টিচিংটা বন্ধ সে কারণে আমরা চিন্তা করলাম এটার বাইরে আর কোনো কিছু করা যায় কিনা? আমরা আমাদের শিক্ষকদের প্রতিটি অধ্যায় পড়ে সে অধ্যায়ের সারাংশ নোট করতে বলেছি। এবং তারা সে অনুযায়ী প্রতিটি অধ্যায় থেকে ১০ থেকে ১২ টি প্রশ্ন তৈরি করেছেন। সে আলোকে তিনি একটা নোট বানিয়েছেন।

যাতে সে নোটগুলো পড়ে বাচ্চারা প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজে নিজে লিখতে পারে। আমরা কোনো উত্তর তৈরি করে দিচ্ছি না। তারা নোটগুলো বাসায় পড়ে নিজেরা প্রশ্ন উত্তর লিখে স্কুলে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

আমাদের শিক্ষকেরা সে উত্তরগুলো পড়ে কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেটা করে আবার বাচ্চার কাছে একটি নিদির্ষ্ট তারিখে পাঠিয়ে দিচ্ছে। নতুন আরেকটি প্রশ্নপত্র দিয়ে।

এতে করে বাচ্চারা ঘরে বসে নিজেরাই পড়তে পারছে এবং বুঝতে পারছে কীভাবে প্রশ্নগুলোর উত্তর করতে হবে। এটাও একধরনের শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যেই পড়ে। আমরা সেভাবেই চেষ্টা করছি বাচ্চাদের আপাতত একটা পড়াশোনার মধ্যে রাখতে।

এটা একটা বিকল্প বলা যেতে পারে। কিন্তু ক্লাসরুম টিচিংয়ের সাথে এর কোনো তুলনাই হয় না। একজন শিক্ষার্থীর কোনো একটা বিষয়ে ভালো বোঝার জন্য ক্লাসরুম শিক্ষার কোনো বিকল্প আর কিছু হতে পারে বলে আমি মনে করি না।  

আমরা নিশ্চিত যারা অবরোধ দেন এবং আমরা যারা ভুক্তভোগী তাদের সবার ছেলেমেয়ে আছে। এবং যেহেতু সবার ছেলেমেয়ে আছে সেহেতু তাদের বিবেকও নাড়া দিবে একদিন। আমরা সেটারই প্রতিক্ষায় এখন।

যারা এগুলো করছেন তারা যদি বাসায় নিজেদের সন্তানদের দিকে একবার তাকান তাহলে বোধহয় তারা নিজেরাই উত্তরটা পাবেন। এবং আজকাল বাচ্চারা টেলিভিশনে অবরোধের যে দৃশ্য দেখছে তাতে তারা মানসিক একটা ডিসঅর্ডারেও কিন্তু ভুগতে পারে। যেটা আমি, আপনি চাইলেও হয়তো কোনোদিন শুধরে দিতে পারবো না। 

যখন আমরা প্রথম স্কুল খুললাম তখন একজন মা এসে আমাদের একটা প্রশ্ন করলরে-যদি আমার বাচ্চার কিছু হয় তাহলে কী আপনারা কোনো দায়িত্ব নেবেন? প্রশ্নটা আমাদেরকে বেশ তাড়িত করে। তখন আমরা সবাই বসে বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে স্কুল বন্ধ রেখেছি। এখন বন্ধের পালা অনেকদিন চলে গেছে। এখন সেই বাবা-মাই এসে কী বলছে জানেন?

বলছে আমাদের বাচ্চারা প্রতিদিন ঘরে বসে থেকে থেকে এখন হুংকার দিচ্ছে আমাকে বাইরে যেতে দাও। আমি বেরিয়ে যাবো। আমাকে খেলতে দাও। আমাকে স্কুলে যেতে দাও। যে আমি এসে একদিন স্কুল বন্ধ রাখতে বলেছি সেই আমি আজ বলছি আপনারা স্কুল খুলে দেন। যা হবার হবে। আর ঘরে পারছি না। এমন একটা অবস্থায় বাবা-মা এসে পৌছেছে এখন।

তবে একটা কথা আমি একটু আলাদা ভাবে উল্লেখ করতে চাই। সেটা হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন দেশের মানুষেরাই। কিন্তু আমাদের ইংরজেি মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় সেই ইংল্যান্ড থেকে। তারা যেদিন পরিক্ষার দিন ধার্য করে সেদিন হরতাল বা অবরোধ করে এমনকি কোনো কিছু করেই সেদিনটা আমরা পেছাতে পারবো না।

সুতরাং আমার বাচ্চাকে ওই পরীক্ষায় বসতে হলে তাকে তৈরি করতেই হবে। এজন্য বাসাতেই বাবা মারা তাদের বিভিন্নভাবে পড়াবেন। এমন অবস্থা যদি চলতেই থাকে তাহলে বাচ্চাদেরও কিন্তু ডাইভার্ট হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভবনা তৈরি হবে। তারা হয়তো বলে বসতে পারে আমরা আর স্কুলেই যাবো না। এখন থেকে বাসাতেই পড়বো।

ডা. জিন্নাত আলী
অধ্যক্ষ, হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুল

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন