আমাদের বীরগাথা

ডিসেম্বর। আমাদের বিজয়ের মাস। বাঙালির গৌরবের মাস। পরাধীনতার শেকল ভেঙে মুক্ত হওয়ার মাস। এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে মুক্তিকামী বাংলার জনগনকে। শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হয়েছে নির্ভীক চিত্তে। স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে অানতে বুকের তাজা রক্তে রাঙাতে হয়েছে মাতৃভূমিকে। বিজয়ের মাসে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানীদের গৌরবগাথার টুকরো কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলাে এ প্রজন্মের পাঠকদের জন্য-

মরহুম ড. আজহার উদ্দিন আহমেদ এবং মরহুমা করিমুন্নেসা বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তান বীরবিক্রম মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ১৯৪৪ সালের ২৯ অক্টোবর ভোলার লালমোহনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে স্নাতকোত্তর পাস করে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এই বীর সেনানী  মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথমে ফার্স্ট ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের  হয়ে পরে জেড ফোর্সের  অধীনে যুদ্ধ করেন।
……………………………………..

‘সব যুদ্ধের আগে আমরা যুদ্ধক্ষেত্র ও তার আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ বা রেকি করে থাকি। কামালপুর আক্রমণের আগেও আমরা রেকি করেছিলাম। আমাদের ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ রেকি করার সময় একটি দুঃসাহসী রেইড করেন কামালপুর বিওপিতে। তারা শত্রুঘাঁটিতে খোঁজখবর নেয়ার জন্য আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে রেকি করতে করতে এতো কাছে চলে গিয়েছিলেন যে বাঙ্কারের কাছে পাকিস্তানি একজন সৈনিক তাদের চ্যালেঞ্জ করে।

ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনের সঙ্গে ছিল চারজন আর পাকিস্তানিরা ছিল দুজন। পাকিস্তানি একজন সৈনিক হল্ট বলতেই ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন তার ওপর লাফিয়ে পড়েন। ঐ সৈনিকের সঙ্গে সালাউদ্দিনের মল্লযুদ্ধ হয়। আমাদের সংখ্যাধিক্য দেখে এবং যখনই বুঝতে পারে যে এরা মুক্তিযোদ্ধা তখন তারা হাতাহাতি ছেড়ে দিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে। তখন আমাদের সৈনিকরা গুলি করে ঐ দুজনকে হত্যা করে ওদের রাইফেল নিয়ে আসে।

এই দুঃসাহসিক আক্রমণের ফলে পাকিস্তানিরা ভেবেছিল এটা নিশ্চিত ভারতীয় কমান্ডোদের কাজ। তাই সম্ভাব্য একটি আক্রমণের অপেক্ষায় তারা আরো প্রস্তুত হয়ে সেখানে অপেক্ষা করছিল। তার দুদিন পরেই আমরা এই কামালপুরের আক্রমণ করি। শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজের এমন দুঃসাহসী কর্মকা- আমার স্মৃতিকে আজো আন্দোলিত করে।

‘জামালপুর জেলার সীমান্তবর্তী একটি ঘাঁটি কামালপুর। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর এক কোম্পানি বেশি সৈন্য দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণব্যুহে নিয়োজিত। তাদের রক্ষণব্যুহে ছিল শক্তিশালী কংক্রিট বাঙ্কার। যার সামনের দিক কাঁটাতারের বেড়া। চারদিকের গাছ-গাছড়া কেটে একদম খোলা মাঠের মতো করা হয়েছে। যাতে রয়েছে বিস্তৃত মাইনফিল্ড। এছাড়া কামানের গোলা তাদের সাহায্য করার জন্য সবসময় প্রস্তুত।

সে রকম জায়গায় কামানের সাহায্য ছাড়াই আমাদের আক্রমণ করতে হয়েছে। কোনো নিয়মিত বাহিনীর সৈনিককে যদি এ ধরনের আক্রমণ চালাতে বলে তাদের পক্ষে এ ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করা সম্ভব নয় এবং কেউ করবেও না। কারণ এ ধরনের শক্তিশালী রক্ষণব্যুহে আক্রমণ করতে হলে কামানের গোলার সাপোর্ট প্রয়োজন। এবং অনেক দক্ষ সৈনিকের প্রয়োজন।

কিন্তু আমরা এ আক্রমণ চালালাম কামানের সাহায্য ছাড়াই। ৩০-৩১ জুলাই রাতে সিনিয়র টাইগার বা ফার্স্ট ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে রওনা হলো এবং ভোররাতে যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের পক্ষে অংশ নেয় দুটো কোম্পানি ব্রাভো কোম্পানি এবং ডেলটা কোম্পানি। ব্রাভো কোম্পানির কমান্ডার ছিলাম আমি।

ডেলটা কোম্পানির কমান্ডার ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ নামের দুঃসাহসী যোদ্ধা। ফার্স্ট ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরোনো অফিসাররা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে পুনরায় আমাদের কোম্পানিতে যোগ দেন। সবার  প্রথমে ডেলটা কোম্পানি, ফলোআপ হিসেবে আমার ব্রাভো কোম্পানি এবং সবশেষে ‘আর’ গ্রুপ নিয়ে ছিলেন মেজর মঈন এবং মেজর জিয়াউর রহমান।

ব্রিগেডের প্রথম অ্যাটাক সরজমিন প্রত্যক্ষ করার জন্য মেজর জিয়াও সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। আক্রমণের সময় ৩১ জুলাই ভোর রাত ৩.৩০ মিনিট। আমাদের সমস্যা হয়েছিল। আমরা সময় মতো যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাতে পারিনি। ফলে আমরা অবস্থান নেয়ার আগেই আমাদের সহায়তা করার জন্য ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক নিক্ষেপকৃত শেল আমাদের ওপর আসতে শুরু করে।

পাকিস্তানি বাহিনীও এই সময় শেলিং শুরু করলে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আমাদের সৈনিকরা দিশেহারা হয়ে এদিক সেদিক দৌড়াতে শুরু করে। অনেকে মাটিতে শুয়ে পড়লো। সৈনিকদের এই দুর্দশা দেখে আমি ও ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে বাধ্য হই। আমাদের কঠোর শাসন ও উদ্যম অনুপ্রেরণায় সৈনিকরা তাদের উদ্যম ফিরে পেলো এবং ‘জয়বাংলা’ হুংকার ছেড়ে শত্রুর দিকে সম্মুখযুদ্ধে এগিয়ে গেলো।

সেই ভয়াবহ আক্রমণে আমরা মাইনফিল্ড পেরিয়ে, কাঁটাতার পেরিয়ে ঢেউয়ের মতো শত্রুর বাঙ্কারের ওপর আঘাত হানি এবং কিছুটা অংশ আমরা দখল করি। কিন্তু এটি করতে গিয়ে আমাদের তুমুল যুদ্ধ করতে হয়। অনেক হতাহত হয়।

দুইশ জনের মধ্যে প্রায় একশ জনই হতাহত হয়। যখন ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটতে শুরু করল তখন দেখি চতুর্দিকে মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে। আমরা কিছু অংশ দখল করলেও আমাদের যে দুজন কমান্ডার সেই দুজনই অর্থাৎ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন শহীদ হন সেখানে এবং আমিও আহত হই।

যার ফলে আমাদের এই দুটি কোম্পানি কমান্ডারবিহীন হয়ে পড়ে। এতো বেশি হতাহত হওয়ার কারণে আমরা যেটুকু দখল করেছিলাম সেটিও ধরে রাখতে পারিনি। আমাদের পিছিয়ে আসতে হয়। আমাদের তেত্রিশ জন শহীদ, ছেষট্টিজন এখানে মারাত্মকভাবে আহত হয়।

সূত্র : ‘৭১ বীরত্ব বীরগাথা বিজয়’- বইয়ের প্রথম খণ্ড থেকে সংগৃহীত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন