আমাদের বীরগাথা

ডিসেম্বর। আমাদের বিজয়ের মাস। বাঙালির গৌরবের মাস। পরাধীনতার শেকল ভেঙে মুক্ত হওয়ার মাস। এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে মুক্তিকামী বাংলার জনগনকে। শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হয়েছে নির্ভীক চিত্তে। স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে অানতে বুকের তাজা রক্তে রাঙাতে হয়েছে মাতৃভূমিকে। বিজয়ের মাসে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানীদের গৌরবগাথার টুকরো কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলাে এ প্রজন্মের পাঠকদের জন্য-

ClassTune

কমডোর (অব.) আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, (সংক্ষেপে এ. ডাব্লিউ. চৌধুরী) বীর উত্তম, বীর বিক্রম, পিএসসি, সাবমেরিনার-এর গ্রামের বাড়ি তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনীতে। কিন্তু তার জন্ম ফেনীতে। তিনি তার শৈশব আর কৈশোরের পার করেছেন ঢাকার আজিমপুর, হাতিরপুল, ফার্মগেইট ও মহাখালী এলাকায়। কমডোর (অব.) এ. ডাব্লিউ. চৌধুরীর বাবা মরহুম ডা. শামসুল হুদা চৌধুরী একজন স্বনামধন্য পুষ্টিবিদ এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছিলেন। মায়ের নাম মরহুমা গুল-এ-আনার বেগম। তেজগাঁও পলিটেকনিক স্কুলের ছাত্র কমডোর (অব.) আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, বীর উত্তম, বীর বিক্রম, পিএসসি ম্যাট্রিক পাশের পরপরই পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে করাচী চলে যান। এই বাহিনী থেকেই প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি সাবমেরিন সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধচলাকালীন তিনি ইন্দোনেশিয়ান সাবমেরিন ‘নাগারাংসাং’-এ যোগ দেন।

১৯৬৮ সালে তিনি তুরস্কেও যান। ১৯৭০ সালের অনেক আগেই পাকিস্তান নৌবাহিনী ফ্রান্স থেকে তিনটি সাবমেরিন কেনার অর্ডার দিয়েছিল। এই সাবমেরিনগুলোর অন্যতম একটি ‘পিএনএস ম্যানগ্রো’তে যোগদানের উদ্দেশ্যে কমডোর (অব.) আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী ১৯৭০ সালে ফ্রান্সে  যান। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আটজন বাঙালি সাবমেরিনারকে নিয়ে পালিয়ে দিল্লীতে আসেন। সাবমেরিনারদের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ নৌবাহিনী’ গঠিত হলে তিনি সহ অন্যান্য সাবমেরিনাররা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে একই সাথে দুইটি খেতাবে ভূষিত করেন। ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামক নৌ-কমান্ডো অপারেশনের অর্ন্তভুক্ত চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কমোডর (অব.) আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীকে ‘বীর উত্তম’ উপাধি প্রদান করেন। একই সাথে ১৯৭১ সালের ২৯ মে অন্যান্য সাবমেরিনারদেকে সঙ্গে নিয়ে সর্বপ্রথম ফ্রান্স থেকে হয়ে আসা এবং সফলতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সকল অপারেশন সম্পন্ন করার জন্য তাকে ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
……………………………………….

১০ আগস্ট ঝিরঝিরি বৃষ্টির মধ্যে আমরা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই। যে পথেই যাচ্ছিলাম সেটাই কাদা-পানিতে ভরা ছিল। আমাদের সবার পরনে ছিল ছেঁড়া লুঙ্গি ও ছেঁড়া শার্ট। পা ছিল খালি। প্রত্যেকের মুখেই খোঁচা খোঁচা দাড়ি ও চুল এলোমেলো। এভাবে পোশাকে ও চেহারায় আমরা ক্যামোফ্লাজড হয়ে নিজেদের আড়াল করে নিয়েছিলাম। যাতে করে পাকিস্তানি বা তাদের দোসররা আমাদেরকে চিনতে না পারে।

আমাদের সাথে ছিল ৬০টি লিমপেড মাইন ও প্লাস্টিকে মোড়া ৬০টি ডেটোনেটর। এগুলো বেশ কয়েকটা ঝুড়িতে সাজিয়ে নিয়ে তার উপরে সবজি দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম। আমার কাছে একটা স্টেনগান ছিল প্রয়োজনের সময় কাভার দেয়ার জন্য। ডেটোনেটোরগুলো প্লাস্টিকের ব্যাগে নিয়েছিলাম। পথ দেখিয়ে আমাদেরকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্য আমাদের সাথে একজন গাইড ছিলেন। বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশের পর চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার জন্য আমরা প্রতিরাতে প্রায় ৩০ মাইল করে পথ হাঁটতে থাকি।

চট্টগ্রামে গিয়ে উঠি ইস্টার্ন রিফাইনারির সর্বজেষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ার আজিজুর রহমান সাহেবের বাসায়। তিনি ও তার সহধর্মীনি আমাদের অপারেশনে অনেক সাহায্য করেছেন। তার সহধর্মীনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তারা দুইজনই ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালিয়ে আমাকে ও আমার ডেপুটিকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত বন্দরের কিছুটা এলাকা রেকি করিয়ে আনতেন। আমাদেরকে এই অপারেশনে যারা পাঠিয়েছেন তারাই ঠিক করে রেখেছিলেন যে আমরা আগ্রাবাদে পৌঁছার পর এখানকার কয়েকজন গাইড আমার দলের ৬০জন ছেলেকে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন এলাকায় নিয়ে যাবেন।

সে অনুযায়ী আমি আমার ছেলেদের ২০ জন করে ভাগ করে তিনটা উপদলে বিভক্ত করে নিয়েছিলাম। সার্বিক নেতৃত্বের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। আমার সাথে রইলেন ডেপুটি লিডার ডা. শাহ আলম। ১৩ তারিখ সকাল ৬টা দিকে আমি সীতাকুণ্ডের এক মাটির বাড়িতে শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ রেডিওতে ঘোষণা হলো ‘এবার শুনুন পঙ্কজ মল্লিকের গান।’ এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার গায়ের সব লোম যেন দাঁড়িয়ে গেল। মুহূর্তে ঘুম কেটে গেল। নীরবে রেডিও শুনতে থাকলাম। চেয়ে দেখলাম শাহ আলমও সজাগ হয়ে রেডিও শুনছে। অন্য সব স্বাভাবিক গানের মতোই ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান। তার বদলে চাইনি কোন প্রতিদান’ গানটি বাজতে থাকল।

কিন্তু আমরা বুঝে গেলাম আমাদের অপারেশনের ‘৪৮ ঘণ্টা আগের’ সংকেতটি চলে এসেছে। আরো বুঝলাম ঠিক এই গানটিই বিকেল ৬টায় আবারও বাজবে। গানটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে যেসব গাইডরা ৬০জন কমান্ডোকে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন এলাকায় নিয়ে যাবেন তাদেরকে বললাম ‘আপনাদেরকে যেভাবে ব্রিফ করা হয়েছে সে অনুযায়ী আপনারা এই মুক্তিযোদ্ধাদের সেসব জায়গায় নিরাপদে পৌঁছে দিন।’ আশ্চর্যের বিষয়টি হলো মুক্তিযুদ্ধের সময় চারদিকে ছিল পাকিস্তান সৈন্য ও তাদের এদেশী দোসররা। কিন্তু গাইডরা ৬০ জন তরুণ নৌ-কমান্ডোকে নিরাপদে সীতাকুণ্ড থেকে আগ্রাবাদ হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেন।

স্থানীয় এসব গাইডের মধ্যে ছিলেন মঈনুদ্দীন খান বাদল, মাওলানা সৈয়দ, হারিস জালাল, আবু। এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন। চট্টগ্রামে এসেই তাদের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমরা কীভাবে, কোথায় থাকব, কী খাবো সব কিছুর ব্যবস্থা এই গাইডরা করেন। ১৩ তারিখ বিকেল ৬টায় মওলা ভাইয়ের বাসার সিঁড়িতে বসে প্রথম গানটা আবারও শুনলাম। কনফার্ম হয়ে গেলাম অপারেশন ১৫ তারিখ রাত ১২টায় হবে।

এই গান শোনার পর আজিজুর রহমান সাহেবের গাড়িতে করে গাইডের সাথে আমি, খুরশীদ নামের আমার বডিগার্ড ও শাহ আলম রওনা হই। আমার বডিগার্ডকে বলা ছিল যে আমি যদি পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়ি তাহলে সে যেন ‘আমাকে গুলি করে মেরে ফেলে’। আমি যেন কোনভাবেই পাকিস্তানিদের হাতে ধরা না পড়ি। এজন্য তার কাছে একটি পিস্তল দিয়ে রেখেছিলাম। এই গাইডের পৈত্রিক বাড়ি কুমিল্লা হলেও বসবাস করতেন চট্টগ্রামে।

গাইড আমাদেরকে সীতাকুণ্ডু থেকে চট্টগ্রাম শহরের বাসে তুলে দিল। আমরা স্থানীয়ভাবে যেসব ছোট ছোট কলাগুলো পাওয়া যায় ওগুলো খেতে খেতে স্বাভাবিক ভাবে বাসের পথটা অতিক্রম করলাম। আমাদের কারো চোখে-মুখে কোন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল না। এরপর আমরা গিয়ে উঠি নিজাম রোডস্থ মওলা ভাইয়ের বাসায়। গিয়ে দেখি ওই বাড়িতে ভাই-ভাবী কেউ নেই। বাসায় শুধু আছে তাহের নামের একটি ছেলে। সে হলো ওই বাড়ির কেয়ারটেকার ও বাবুর্চি। আমরা চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছার পর জানতে পারলাম ইতোমধ্যে গাইডরা ৫৮ জন নৌ-কমান্ডোকে আগ্রাবাদ পৌঁছিয়ে দিয়েছে।

এরপর গাইডদের নির্দেশ দিলাম নৌ-কমান্ডোদেরকে কর্ণফুলী নদীর অপরপাড়ে অবস্থিত জেটির বিপরীত দিকে থাকা জেলেদের খামারে পৌঁছে দিতে। আরো নির্দেশ দেয়া হলো যে নৌ-কমান্ডোরা ওখানে জেলেদের ছদ্মবেশে থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর জেটি থেকে ১৫ নম্বর জেটি পর্যন্ত যতদূর পারা যায় সবগুলোর উপরে রেকি করে টার্গেট নির্ধারণ করবে। তবে নৌকমান্ডোদের পক্ষে ১৫ নম্বর জেটি পর্যন্ত রেকি করা সম্ভব হয় নাই। ওরা ১১ নম্বর জেটি অর্থাৎ চিটাগাং ড্রাইডক জেটি (সিডিডি) পর্যন্ত রেকি করতে পেরেছিল। 

মওলা ভাইয়ের বাসায় থাকতেই ১৪ তারিখ ভোর ৬টায় শুনতে পেলাম দ্বিতীয় গানটি। সেদিন সারা দিন, সারা রাত গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টি হওয়াতে আমি বরং খুশিই হলাম। কারণ অ্যাপারেটাস ছাড়া সাঁতার কাটলে পানির বেশি গভীরে যাওয়া যায় না। এমনকি বেশিক্ষণ পানির নিচে থাকাও যায় না। তাই বারবার পানির উপরে এসে নাক তুলে নিঃশ্বাস নিয়ে আবার পানির নিচে ডুব দিতে হয়।

এজন্য বৃষ্টির মধ্যে আমাদের কার্যকলাপ জাহাজের সেন্ট্রিরা টের পাবে না। তাছাড়া বৃষ্টির সময় জাহাজের গার্ডেও কিছুটা শৈথিল্য আসে। আগেই বলা ছিল যে আমাদেরকে পুরো অপারেশনটা করতে হবে ১০ মিনিটের মধ্যে। এজন্য জাহাজের কাছে আমাদের পৌছাঁতে হবে পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের মধ্যে। এরপর জাহাজের গায়ে মাইন স্থাপন করে আমাদেরকে নিরাপদ দূরত্বে চলে আসতে হবে।

খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল যে ছেলেগুলো নির্দেশ মতো নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পৌঁছতে পেরেছে কী না, বা তারা সেখানে কেমন আছে ইত্যাদি। আমি শুধু গাইডদের বলেছিলাম ছেলেদের ওখানে পৌঁছে দিতে। তারা পরে আমাকে জানিয়েছিল যে সবাই নির্দেশ মতো পৌঁছে গেছে। এই কথার উপর ভিত্তি করেই আমি রওনা হয়ে যাই মূল অপারেশন করার জন্য। ১৫ আগস্ট রাত প্রায় ১০টা কি সাড়ে ১০টার সময় আমরা চট্টগ্রামের সদরঘাট দিয়ে একটা নৌকায় করে নদীর ওপারে চলে আসি। নদী পাড় হওয়ার সময় দেখি নদীতে পাকিস্তানিরা গানবোট নিয়ে টহল দিচ্ছে। এটা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। আমার কাছে পলিথিনে মোড়ানো ডেটোনেটরগুলো ছিল।

ওগুলো যাতে কেউ দেখতে না পারে সেজন্য ওগুলো নৌকার পাশ ঘেঁষে বেঁধে নদীর পানিতে চুবিয়ে রেখেছিলাম। যাই হোক কোন সমস্যা ছাড়াই নদী পার হতে পারলাম। এরপর সেখান থেকে দৌঁড়ে চলে আসি যেখানে আমার ছেলেদের অপেক্ষা করার কথা সেখানে। ওখানে যাবার পর অন্ধকারের মধ্যে আমাদের সেন্ট্রি আমাকে চিনতে না পেরে বলে উঠল ‘হল্ট। হু কামস দেয়ার?’ এসবের প্রশিক্ষণ ওদেরকে ক্যাম্পেই দেয়া হয়েছিল। আমি নিজের পরিচয় দিলাম। আমাকে দেখেই ওরা বুঝতে পারল ‘আজ রাতেই হয়তো অপারেশন করতে হবে।’

আমি নদী পার হয়ে ছেলেদের কাছে পৌঁছে দেখি দুইটি উপদল আসতে পেরেছে। কিন্তু আরেকটি উপদল তখনও পৌঁছতে পারে নাই। রাত ১০টার মধ্যেও তারা যখন এসে পৌঁছতে পারল না তখন আর ওই দলটির জন্য অপেক্ষা করলাম না। উপস্থিত ৪০ জনকেই এক জায়গায় সমবেত করলাম। কারণ আজ রাত অর্থাৎ ১৫ আগস্ট রাত ১২টা থেকে ১২টা ১ মিনিটের মধ্যে আমাদেরকে টার্গেটে হিট করতে হবে। অন্য উপদলের জন্য অপেক্ষা করলে আমরা অপারেশন টাইম মিস করতে পারি।

তাহলে পুরো অপারেশনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। কারণ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরই হলো পাকিস্তানিদের জন্য প্রধান লাইফ লাইন। এই লাইন কেটে দেয়াই আমাদের অপারেশনের মূল টার্গেট। তাই আমরা টার্গেটে রওনা হবার আগে আমাদেরকে সেফটি কাভারেজ দেয়ার জন্য সাত জনকে তীরে রেখে গেলাম। ওরা স্টেনগান নিয়ে তীরে আমাদের সিকিউরিটিতে থাকবে। ওদেরকে আরো বললাম যে দলটি এসে পৌঁছতে পারে নাই তাদের কাছে খবর পাঠিয়ে বলো যে তারা যেন অপারেশন এলাকায় আর না আসে। বরং তারা আগ্রাবাদেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করুক। আমি ৪০ জনকে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলাম। ৪০টা মাইন ডেটোনেটর দিয়ে প্রস্তুত করলাম।

এসময় আজিজুর রহমান সাহেব আমাকে বলেন রেকি করে দেখা গেছে যে বন্দরে ১১টা মাছ আছে। আমরা বন্দরে ভেড়ানো জাহাজের কোড নেম রেখেছিলাম ‘মাছ’। মাছগুলো কোথায় কোন জেটিতে আছে সব বললেন। সে অনুযায়ী আমরা টার্গেটে হিট করার জন্য ৩৩ জনকে নিয়ে মোট ১১টা দল করলাম।

একটি জাহাজে হিট করার জন্য প্রতি দলে তিনজন করে থাকবে। একটা শিপের সম্মুখভাগে থাকবে একজন, মধ্যখানে একজন এবং পেছনে একজন। পানির উপরের তল থেকে ছয় ফুট নিচে জাহাজের গায়ে মাইন স্থাপন করতে হবে। পানির উপরে স্থাপন করা যাবে না। কারণ তাহলে জাহাজ ডুববে না। পানির নিচে মাইনের বিষ্ফোরণ হলে আট ফুট আকৃতির একটি গর্ত হবে। তিনটি মাইনের বিষ্ফোরণে তিনটি গর্ত হলে তা দিয়ে পানি জাহাজের ভেতর ঢুকে যাবে। ফলে জাহাজ এক পাশে কাত হয়ে ডুবে যাবে।

১১টি দলের জন্য আলাদা আলাদা টার্গেট নির্দিষ্ট করে দিলাম। এমনকি একটি দলের কোন জন জাহাজের সামনে, মাঝখানে বা পেছনে মাইন স্থাপন করবে তাও ঠিক করে দিলাম। আমার গ্রুপে রাখলাম সত্যেন ও বিধান নামের দুই জনকে। ওদেরকে নিয়ে আমি ৩ নম্বর টার্গেট জাহাজে হিট করব বলে ঠিক করলাম। ১১টি দলের প্রত্যেককে বললাম ‘পানিতে নামার আগে প্রত্যেকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার জন্য যেতে যেতে মনে মনে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত গুণবে।

এরপর সাঁতরিয়ে টার্গেটে মাইন স্থাপন করবে। কারণ যারা দূরের জাহাজের দিকে যাবে তাদের ওই পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতে সময় লাগবে। তাই তাদেরকে টার্গেটে গিয়ে পৌঁছতে সময় দিতে হবে। এসব কিছু ঠিক করে আমরা পানিতে নামলাম সম্ভবত রাত ঠিক ১২টায়। পেটে মাইন বেঁধে প্রত্যেক দলই সাঁতরে চলল টার্গেটের দিকে। পানিতে বেশ স্রোত ছিল। এজন্য আমরা কোণাকুণিভাবে স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কেটে নিজ নিজ টার্গেট জাহাজের দিকে যাচ্ছিলাম।

পানিতে নেমে লক্ষ্যের দিকে যেতে হলে কখনও সোজাসুজি সাঁতার কেটে যাওয়া যায় না। বড় বড় জাহাজও সোজাসুজি যেতে পারে না। কারণ চলন্ত জাহাজের নিচে পানির স্রোত যে শক্তিতে ধাক্কা দেয় বা চাপ দেয় তা মোকাবেলা করেই জাহাজকে এগিয়ে যেতে হয়। আমি যখন সাঁতার কেটে জাহাজের থেকে প্রায় কাছাকাছি চলে গিয়েছি তখন হঠাৎ করে মনে হলো আমার মায়ের কথা। মাইন বিষ্ফোরণে আমি মরেও যেতে পারি। তাই মনে মনে মাকে বললাম ‘মা, আমি আর পাঁচ বা দশ মিনিটের মধ্যেই তোমার কাছে চলে আসছি।’ সাঁতার শুরু করার সম্ভবত পাঁচ বা ছয় মিনিটের মধ্যে আমার দলের তিন জনের সবাই টার্গেট জাহাজের কাছে পৌঁছে গেলাম।

আমরা তিনজন টার্গেট জাহাজের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যার যার টার্গেট স্থানে পৌঁছে গেলাম। এখন পানির উপরের স্তর থেকে ছয় ফুট নিচে নামতে হবে। এজন্য আগেই হিসাব করে ৩৩ জনকে বলে দিয়েছিলাম যে একজন বাঙালি সাধারণত ৫ ফুট বা ৫ ফুট কয়েক ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকেন। কিন্তু ৬ ফুটের নিচেই লম্বা হন। এজন্য পানির উপরের স্তর থেকে জাহাজের গা ছুঁয়ে নিচের দিকে ‘এক মানুষ ও এক হাত সমান’ মেপে নিয়ে জাহাজের গায়ে মাইন লাগাতে হবে। এটা মেপে নিয়ে জাহাজের গায়ের শ্যাওলাগুলো স্ক্র্যাপ করা শুরু করলাম। আমার পেট থেকে মাইন খুলে নিয়ে জাহাজের শ্যাওলা তোলা জায়গায় স্থাপন করলাম। মাইনে একটি পিন লাগানো থাকে।

মাইনটি সক্রিয় করার জন্য ওই পিনটি টেনে খুলে নিয়েই আমাদেরকে স্রোতের অনুকূলে সাঁতার কেটে তীরে ফিরে আসতে হবে। পিন খোলার সঙ্গে সঙ্গে মাইনে বিষ্ফোরণ ঘটবে না। কারণ মাইনে প্রায় ৩০ মিনিটের ডিলে সিস্টেম করে রাখা হয়েছে। এই ৩০ মিনিট সময়ের মধ্যেই আমাদের প্রত্যেককে জাহাজের কাছ থেকে যতটা পারা যায় দূরে সরে যেতে হবে। তীরের যে জায়গায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে প্রত্যেককে সেখানে গিয়ে উঠার চেষ্টা করতে হবে।

পলাশীর ট্রেনিং সেন্টার থেকে আমাদেরকে এমন ধরনের ব্রিফিং-ই দেয়া হয়েছিল। জাহাজে মাইন স্থাপন করে আমরা যখন ফিরে আসছি পোর্টের জেটিতে থাকা পাকিস্তানি সেন্ট্রিরা হয়তো টের পেয়ে গিয়েছিল। কারণ আমরা প্রত্যেকেই তখন দ্রুত সাঁতার কাটছিলাম। তাই পানিতে হয়তো সেই চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। সেটা দেখে সেন্ট্রিরা পানির দিকে লক্ষ্য করে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করতে থাকে। আমাদের কানের পাশ দিয়ে গুলিগুলো চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে কোন গুলিই আমাদের কারো শরীরে লাগল না। আমরা সবাই নিরাপদে তীরে ফিরে আসতে পারলাম।

নিরাপদ স্থানে সবাই একত্রিত হওয়ার পর প্রথমে গুণে দেখলাম দলের ৩৩ জনের সবাই ফিরে আসতে পেরেছে কিনা। সবাই ফিরেছে দেখে স্বস্তি পেলাম। মুহূর্তের মধ্যে সবাইকে নির্দেশ দিলাম যে এখানে আর এক মিনিট সময়ও নষ্ট করা যাবে না। যতদ্রুত পারা যায় এই এলাকা ত্যাগ করতে হবে। গাইড আমাদের সবাইকে নিয়ে দৌঁড়ে চলল। আমরা যখন দৌঁড়ে চলছিলাম তখন পেছনের দিকে একের পর এক বিষ্ফোরিত হচ্ছিল ৩৩টা মাইন।

বিষ্ফোরণের ধাক্কায় মনে হচ্ছিল মাটিতে ভূমিকম্প হচ্ছে। সুইমিং কস্টিউম পরেই আমরা সারা রাত ও পরের দিনের ভোর পর্যন্ত দৌঁড়ে চললাম। আমাদের সাথে তখন ড্যাগার ও মাইনের পিনের মতো বাড়তি কিছু জিনিষ ছিল। বাংলাদেশে ছোট ছোট ডোবা, পুকুরের তো আর অভাব নেই। দৌঁড়ে চলার সময় দলের কে কোথায় তাদের ওসব জিনিস ফেলেছে তার ঠিক নেই। যে যেখানে পেরেছে ফেলে দিয়েছে। ভোর বেলা গিয়ে পৌঁছলাম স্থানীয় এক আওয়ামী লীগের নেতার বাড়িতে। প্রথমে আমরা পুকুরে গোছল করে নিলাম। এরপর সুইমিং কস্টিউম পরেই ওই বাড়ির এক ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিলাম।

সকাল বেলা আমাদের প্রত্যেকের জন্য নতুন লুঙ্গি ও নতুন শার্ট চলে এল। এসবের আয়োজন কে বা কারা করল তার কিছুই জানি না। হয়তো মাওলানা সৈয়দ হারিছ, মইনুদ্দিন খান বাদল, আতাউর রহমান কায়সার, এস.এস. ইউসুফ, জালাল ও আবু প্রমুখ এসবের আয়োজন করেছেন। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ-কমান্ডো অপারেশন সম্পন্ন করার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন এই কয়েকজন মানুষ। এই বাড়িতে এসে শুনলাম চট্টগ্রাম বন্দরের দিক থেকে পরপর ৩৩টা মাইন বিষ্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া গেছে। আগ্রাবাদে বা চট্টগ্রাম শহরের যারা ওই রাতে খাটে শুয়ে ছিল তারা নাকি ওই শব্দের ধাক্কায় খাট থেকে পড়ে গেছে।

আর যে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে আমরা অপারেশনের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম ওই আওয়াজ শুনে আমাদের জন্য দুঃশ্চিন্তায় ওই বাড়ির কেউ সারা রাত ঘুমাতে পারে নাই। আমরা সবাই ভালো আছি এটা জানার পর তারা স্বস্তি পেয়েছে। এত বড় একটা অপারেশন সম্পন্ন করার পরও আমরা কেউ শত্রুর হাতে ধরা পরি নাই বা কেউ মারা যাই নাই। আমরা প্রত্যেকেই জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিলাম। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া ছিল।

১৬ তারিখ সকালে খবর আসল চট্টগ্রাম বন্দরে ৯ টা জাহাজ ডুবেছে। আমাদের এই অপারেশনটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। খবরের শিরোনাম হয় ‘চিটাগাং পোর্ট নন-অপারেশনাল’। তখনই জানতে পারলাম এই নৌকমান্ডো অপারেশনের নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’।
 

সূত্র : '৭১ বীরত্ব বীরগাথা বিজয়'- বইয়ের প্রথম খণ্ড থেকে সংগৃহীত