মুহম্মদ জাফর ইকবাল : একজন সাদাসিধে কথার মানুষ

4958
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর অন্যতম পথিকৃত মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনি একাধারে লেখক, পদার্থবিদ এবং শিক্ষাবিদ। এছাড়া তিনি জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক এবং কলাম লেখক। সহজ সরল ভাষায় সাদাসিধে কথা বলার জন্যও তিনি সুপরিচিত। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত করা হয়েছে।

একটি জরিপের তথ্য অনুসারে, তিনি লেখক হিসেবে বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে; জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪৫০ জনের মধ্যে ২৩৫ জনই (৫২.২২%) তার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

ClassTune

জন্ম ও পারিবারিক জীবন

১৯৫২ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁর পিতা মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। বাবা ফয়জুর রহমান আহমদের পুলিশের চাকরির সুবাদে তাঁর ছোটবেলা কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়।

যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার সময় জাফর ইকবাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ড. ইয়াসমিন হকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ইয়াসমিন হক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। তাঁদের দুই ছেলে নাবিল ইকবাল ও মেয়ে ইয়েশিম ইকবাল।

বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর বড় ভাই এবং রম্য ম্যাগাজিন উন্মাদের সম্পাদক ও কার্টুনিস্ট, সাহিত্যিক আহসান হাবীব তাঁর ছোট ভাই।

প্রাথমিক জীবন

মুহম্মদ জাফর ইকবালের নাম আগে ছিলো বাবুল। পিতা লেখালেখির চর্চা করতেন এবং পরিবারের এই সাহিত্যমনস্ক আবহাওয়ায় জাফর ইকবাল খুব অল্প বয়স থেকেই লিখতে শুরু করেন। এটিকেই তিনি তার সহজ ভাষায় লিখতে পারার গুণের কারণ বলে মনে করেন। তিনি তার প্রথম বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লেখেন সাত বছর বয়সে। ১৯৭১ সালের ৫ মে পাকিস্তানী আর্মি এক নদীর ধারে তাঁর দেশপ্রেমিক পিতাকে গুলি করে হত্যা করে। বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া জাফর ইকবালকে পিতার কবর খুঁড়ে তাঁর মাকে স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারটি বিশ্বাস করাতে হয়েছিলো।

শিক্ষাজীবন

জাফর ইকবাল ১৯৬৮ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। তিনি ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে অনার্স-এ দুই নম্বরের ব্যবধানে প্রথম শ্রেণীতে ২য় স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। তাঁর বিষয় ছিলো- ‘Parity violation in Hydrogen Atom. সেখানে পিএইচডি করার পর বিখ্যাত ক্যালটেক থেকে তাঁর ডক্টরেট-উত্তর গবেষণা সম্পন্ন করেন।

ছবি : উইকিমিডিয়া

কর্মজীবন

ড. জাফর ইকবাল ১৯৮৮ সালে বিখ্যাত বেল কমিউনিকেশনস রিসার্চ (বেলকোর) এ গবেষক হিসাবে যোগদান করেন এবং ১৯৯৪ পর্যন্ত সেখানেই কাজ করেন। ওই বছরেই তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। তিনি একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মনোনীত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মোবাইল ফোনে ভর্তি প্রক্রিয়া, পিপীলিকা সার্চ ইঞ্জিন, ‘ড্রোন ও রোবট’, ওয়াইফাই ভিত্তিক ক্যাম্পাস, সেমিস্টার পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর মতো নানা যুগান্তকারী অর্জন সম্ভব হয়েছে জাফর ইকবালের হাত ধরে।

তিনি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন শিক্ষক সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক্স প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

হত্যা প্রচেষ্টা

২০১৮ সালে ৩ মার্চ বিকেলে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) উৎসবের রোবটিক প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠান চলছিলো। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে কয়েকজন হুলুস্থুল শুরু করে। সে সময় একজন তাঁর মাথায় হামলা চালায়।

সাহিত্যচর্চা

সাহিত্যমনস্ক পরিবারের সন্তান জাফর ইকবাল খুব অল্প বয়স থেকেই লিখতে শুরু করেন। তিনি প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখেন ৭ বছর বয়সে। তাঁর প্রথম প্রকাশিত সায়েন্স ফিকশন গল্প ‘কপোট্রনিক ভালোবাসা’। এটি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা অনেক কিশোর উপন্যাস থেকে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মিত হয়েছে।

তাঁর বৈশিষ্ট্যসূচক সহজ ভাষায় লেখা কলামগুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক কালের কন্ঠসহ একাধিক পত্রিকায় সাদাসিধে কথা নামে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। তাঁর লেখা কলামগুলোতে তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়।

২০১০ সালে যুগোপযোগী জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সর্বদা সোচ্চার তিনি। ২০০৯ সালে লেখেন ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ নামে ছোট আকারের একটি বই।

গুণী এই লেখকের এ পর্যন্ত সায়েন্স ফিকশন, ভৌতিক রচনাবলি, শিশুতোষ রচনাবলি, ইতিহাস, কিশোর উপন্যাস, উপন্যাস, স্মৃতিচারণা, ছোটগল্পসহ দেড় শতাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি।

পুরস্কার

তিনি ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে ২০০৫ সালে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, ২০০২ সালে কাজী মাহবুবুল্লা জেবুন্নেছা পদক, বাংলা ১৪১০ সালে খালেদা চৌধুরি সাহিত্য পদক, ২০০৩ সালে শেলটেক সাহিত্য পদক, ২০০৪ সালে ইউরো শিশুসাহিত্য পদক, ২০০৫ সালে মোহা. মুদাব্বর-হুসনে আরা সাহিত্য পদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা পদক, আমেরিকা অ্যাল্যামনাই অ্যাসোসিয়েশন পদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন পদক উল্লেখযোগ্য।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট