পানির তড়িৎ বিশ্লেষণ

electrolysis

বিজ্ঞান নিয়ে অনেকের মনেই ভয়ভীতি থাকে। জটিল সব সূত্র, গাণিতিক ব্যাখ্যা আর কাঠখোট্টা সব শব্দ শুনলেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। জটিল সব ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে সহজভাবে তুলে ধরার কাজটিই করছে সায়েন্স রকস টিভি অনুষ্ঠানটি। প্রতি সপ্তাহে ২টি করে ৫২ সপ্তাহে মোট ১০৪টি মজার মজার সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট দেখানো হবে তোমাদের আর বলে দেয়া হবে সেটা কেন হলো, কিভাবে হলো। আজ এক ঝলক জেনে নেয়া যাক সায়েন্স রকস টিভি অনুষ্ঠানের দশম পর্বে দেখানো ‘Electrolysis ’ বা ‘পানির তড়িৎ বিশ্লেষণ’ এক্সপেরিমেন্টটি।

ClassTune

এই পর্বের আগের এক্সপেরিমেন্টে আমরা দেখেছিলাম কিভাবে লোহায় মরিচা পড়ে। লোহায় মরিচা না পড়ার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতিতে এর উপর কম সক্রিয় ধাতুর প্রলেপন দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় তড়িৎ প্রলেপন। তড়িৎ প্রলেপণ হলো তড়িৎ বিশ্লেষণের একটা বিশেষ উদাহরণ। এখানে আমরা দেখাচ্ছি পানির তড়িৎ বিশ্লেষণ।

যা যা লাগবেঃ

এই এক্সপেরিমেন্টের সবগুলো উপাদানই আমরা হাতের নাগালেই পাব। আমাদের দরকার পানি, কাঁচের বিকার, স্টিলের চামচ ২টা, লবণ(সোডিয়াম ক্লোরাইড), ব্যাটারি (৯ ভোল্ট)। নিরাপত্তার জন্য আমাদের দরকার গগলস ও হ্যান্ড গ্লাভস।

যেভাবে করবোঃ

প্রথমে আমাদের কাজ হলো লবনের দ্রবণ তৈরি করা। ভাল তড়িৎ বিশ্লেষনের জন্য দ্রবণে মিশ্রণের অনুপাত ঠিক রাখতে হবে। আর সবচেয়ে ভাল তড়িৎ বিশ্লেষণ ঘটে সোডিয়াম ক্লোরাইডের ১০% জলীয় দ্রবণে। অর্থাৎ ৯০ ভাগ পানি এবং ১০ ভাগ লবণের দ্রবণ। কাঁচের বিকারে ৫৪০ গ্রাম পানি নিয়ে এতে ৬০ গ্রাম লবণ যুক্ত করলাম। ভালভাবে নেড়ে লবণটিকে পানিতে দ্রবীভূত করে নিলাম। পরের কাজটা করার জন্য একজনের সাহায্য দরকার। চামচ দুটা পানিতে ডুবিয়ে এমনভাবে ধরে রাখতে হবে যাতে একটার সাথে অন্যটা না লাগে। এবার ব্যাটারিটা নিয়ে এর দুই মাথা চামচের দুই প্রান্তের সাথে লাগিয়ে ধরে রাখতে হবে। যখনই ব্যাটারি লাগানো হবে তখন আমরা দেখতে পাব একটা চামচ থেকে গ্যাসের বুদবুদ উঠা শুরু হয়েছে।  এই অবস্থায় যখন চামচ দুটো পরষ্পরকে স্পর্শ করাবো তখন বুদবুদ উঠা বন্ধ হয়ে যাবে। আবার আলাদা করলে আবার বুদবুদ শুরু হবে। কিছু সময় পর দেখা যাবে পানির বর্ণ স্বচ্ছ থেকে পরিবর্তিত হয়ে হলুদ এবং আরো পরে তা বাদামীতে পরিণত হয়েছে।

কিভাবে হলোঃ

পানির তড়িৎ পরিবাহীতা খুব কম বলে আমরা এর তড়িৎ পরিবাহীতা বাড়ানোর জন্য সোডিয়াম ক্লোরাইড যুক্ত করলাম। কারণ লবণ ইলেক্ট্রোলাইট হিসেবে কাজ করে যা পানিতে দ্রবীভুত হয়ে পানির তড়িৎ পরিবাহীতা বৃদ্ধি করে। আমাদের মিশ্রনে এ লবণ সোডিয়াম এবং ক্লোরিন আয়ন হিসেবে উপস্থিত থাকে। যখন ব্যাটারি যুক্ত করা হল ব্যাটারির ইলেকট্রন নেগেটিভে প্রান্ত থেকে চামচের মধ্য দিয়ে পানিতে আসে পানির তড়িৎ বিশ্লেষণ করে। অন্য চামচ দিয়ে ব্যাটারির পজেটিভ প্রান্তে চলে যায়। ব্যাটারির এই ইলেকট্রিসিটি পানির হাইড্রোজেন বন্ধনকে ভেঙে দেয় এবং হাইড্রোজেন ও হাইড্রোক্সাইড আয়ন তৈরি করে যা দ্রবনে মুক্তভাবে থাকে। লবণ থেকে উৎপন্ন সোডিয়াম আয়ন পানির হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আয়নের সাথে যুক্ত হয়ে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা লাই(lye) উৎপন্ন করে যা তীব্র ক্ষারীয়।

অন্যদিকে দ্রবনে থেকে যায় ক্লোরিন এবং হাইড্রোজেন আয়ন। তারা নিজেদের মধ্যে যুক্ত হয়ে ক্লোরিন এবং হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি করে। চামচের গায়ে আমরা যে বুদবুদ দেখেছিলাম তা এই ক্লোরিন এবং হাইড্রোজেন গ্যাস যা বাতাসে মুক্ত হচ্ছে।

সতর্কতাঃ

দেখানো হয়ে গেল আমাদের ইলেক্ট্রোলাইসিস এক্সপেরিমেন্ট। এই এক্সপেরিমেন্ট কোন খোলা জায়গায় কিংবা ভাল ভেন্টিলেশন যুক্ত জায়গায় করা উচিৎ কারণ এতে উৎপন্ন ক্লোরিন গ্যাস আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা করতে পারে। এই এক্সপেরিমেন্টের আরও একটি উৎপাদ সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা লাই(lye) একটি তীব্র ক্ষার। বিকারের পানিতেই এটি থেকে যায়। এই ক্ষারীয় দ্রবণকে নিষ্ক্রিয় করে তারপর ফেলতে হবে; তা না হলে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। এক্ষেত্রে আমরা ভিনেগার ব্যবহার করতে পারি যা এসিডিক।