সকলের মুস্তাফা মনোয়ার

4240
mustafa-monowar-2

গ্রাম্য মেয়ের শাড়ি পরা একটি পুতুল। নাম তার পারুল। মাথা ঝাঁকিয়ে, হাত দুলিয়ে দুলিয়ে পারুল গান গাইছে, ‘ সাত ভাই চম্পা জাগো রে…’

পুতুলের হাতে, কবজিতে, থুতনিতে, মাথায় যে সুতা বাঁধা তা যেন বেমালুম ভুলে গেলেন দর্শকরা। ভাষা জানা নেই তো কি হয়েছে ! ‘ ভাষার বাধা যে শিল্প দূর করতে পারে, সেটাই তো সবচেয়ে বড় শিল্প ’… কে যেন বলেছিলেন।

ClassTune

গান শেষে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেন মস্কোর দর্শকেরা। হাততালি থামে না ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের দর্শক, তাশখন্দের দর্শকদের। যে মানুষটির হাতের নাচে পুতুল বা পাপেট জীবন্ত মানুষ হয়ে উঠলো, তাকে দেখতে চান সবাই। তিনিই মুস্তাফা মনোয়ার

বাংলার লোক কাহিনীকে পাপেট দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। এদেশে পাপেট শিল্প শুরু করা এবং আজকের পর্যায়ে টেনে নিয়ে আসার একক কৃতিত্ব তাকে দিলেও অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশে থিয়েটার পাপেট অ্যান্ড অ্যানিমেশনের উদ্ভাবক, পরিকল্পক ও গবেষক তিনি।

একজন আন্তর্জাতিক পাপেট শিল্পী হলেও মুস্তাফা মানোয়ারের পাপেটের সঙ্গে শুরু থেকেই বাংলাদেশের লোককথা, রাজনীতি, সংস্কৃতি মিশে আছে। যে কারণে সাত ভাই চম্পার পাশাপাশি আমরা দেখি ‘ বাঘা ’ ও ‘ মেনি ’কে। ১৯৬৭-৬৮ সালের দিকে টেলিভিশনের ‘ আজব দেশে ’ নামে এক অনুষ্ঠানে তার বাঘা ও মেনি চরিত্র দুটি পাকিস্তানকে নানাভাবে ব্যঙ্গ করতো। বাংলাদেশ টেলিভিশনে পাপেট নিয়ে তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ ’ ও ‘ ’ জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশে সম্প্রচারিত হয়েছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত পাপেট্রির আন্তর্জাতিক সংগঠন ইউনিমা’র সদস্য তিনি।

যেভাবে শুরু

পাপেট নিয়ে মুস্তাফা মনোয়ার আগ্রহী হন কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ার সময়। কিন্তু তার শিল্পী মনের শুরুটা কিন্তু আরও আগে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় মুস্তাফা মনোয়ার নায়ারণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। নারায়ণগঞ্জেই মেজবোনের বাড়িতে থাকতেন। সেখানেই বসেই শুনতে পেলেন যে ঢাকায় ভাষা নিয়ে মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছে, কয়েকজন ছাত্র শহীদ হয়েছে।

কিশোর মুস্তাফা এই অনাচার দেখে স্থির থাকতে পারলেন না। তার প্রতিবাদের ভাষা হলো ছবি। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে নানা ধরনের ছবি এঁকে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের দেয়ালে সেঁটে দিলেন। পুলিশ জানতে পেরে তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। এক মাসেরও বেশি সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন তিনি।

অবশ্য এই যে অন্যায় দেখে শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ, এটা তার রক্তে ছিল। তাঁর বাবা গোলাম মোস্তফা বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি, পাশাপাশি একজন শিল্পরসিক ও গায়ক। 

বাবার কর্মক্ষেত্র ছিল কলকাতায়, তাই শৈশবের বেশ কিছু সময় মুস্তাফা মানোয়ারকে কলকাতায় থাকতে হয়েছে। প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে, পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হন।

কিন্তু শিল্পের মানুষ সায়েন্সে ভালো করবেন কিভাবে ? এক পরীক্ষায় অঙ্কে পেলেন চার। কলেজের স্যার পরীক্ষার খাতা দেওয়ার সময় গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ এই ছেলে, তুমি কতো পেয়েছো জানো ? ’

ছেলেটা হেসে উত্তর দিলো, ‘ জানি স্যার!’

‘ আবার হাসছো ! লজ্জা করেনা ? অঙ্কে কেউ কোনোদিন চার পায়? ’

‘ স্যার কোন অঙ্কটা ঠিক হয়ে গেলো, তাই ভেবে হাসছি।’

এই হচ্ছেন আমাদের মুস্তাফা মনোয়ার !

পরবর্তীতে অবশ্য স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে কলকাতা আর্ট কলেজে যান। এর পেছনে যে ব্যক্তির অবদান রয়েছে, তিনি বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও ভ্রমণকারী সৈয়দ মুজতবা আলী। প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি তিনি। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

শিল্পে পদচারণা

কৈশোরের শুরুতেই যে শিল্পীকে শিল্পের জন্য জেলে যেতে হয়েছে, তিনি দুঃসাহসী হবেন না তো কে হবেন? শিল্পের যে কোনো ক্ষেত্রে তাই মুস্তাফা মনোয়ার দুঃসাহস নিয়ে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন, নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। শুধু পাপেট দিয়ে তাঁকে পরিমাপ করা যেন রবীন্দ্রনাথকে শুধু গানের জন্য পরিমাপ করা।

সঙ্গীত:

শিশুকালেই তিনি সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন বাবা ও বড় ভাইয়ের কাছে। প্রথম যে সঙ্গীত শিখেছিলেন তা হচ্ছে জৈনপুরী রাগ। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়ার সময় নতুন করে আবার গান শেখা শুরু করেন ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের কাছে। বঙ্গ সাংস্কৃতিক সম্মেলনে পল্লীগীতি গেয়ে তিনি প্রচুর সুনাম পান। গীত ও গজলেও তাঁর কণ্ঠে অপূর্ব মাধুর্য ছিল।

ছবি:

আর্ট কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি একাডেমি অফ ফাইন আর্টস আয়োজিত সর্বভারতীয় চিত্র প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স আর্টে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। সর্বভারতীয় যুব উৎসবের প্রদর্শনীতেও শ্রেষ্ঠ তেলরঙ এর জন্য তিনি স্বর্ণপদক পান। তেলরঙ ও জলরঙে তার দখল দেখে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ঢাকা আর্টস কলেজে শিক্ষকতা করার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব:

বাংলাদেশ টেলিভিশন বিটিভি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে মুস্তাফা মানোয়ার প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। ১৯৬৪ সালে বিটিভিতে স্টেশন প্রডিউসার হিসেবে যোগ দেন, পরবর্তীতে দীর্ঘদিন বিটিভির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বিটিভির গতানুগতিক অনুষ্ঠান মালা বদলে শিল্পনির্ভর, সৃজনশীল অসংখ্য কার্যক্রম হাতে নেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর প্রযোজিত শেক্সপিয়ারের ‘ ট্রেমিং অব দি শ্রু ’ র, মুনীর চৌধুরী অনূদিত বাংলা টেলিভিশন নাটক ‘ মুখরা রমণী বশীকরণ ’এবং রবীন্দ্রনাথের ‘ রক্তকবরী ’। এই নাটক দুটি যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়াল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা ’র জন্য মনোনীত হয়।

সার্কভুক্ত দেশের টেলিভিশনের জন্য নির্মিত শিশুদের শিক্ষামূলক ‘ মীনাকার্টুন ’ অ্যানিমেশন ফিল্মের পরিকল্পকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। ১৯৭২ সালে বিটিভি থেকে প্রচারিত শিশু প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে জনপ্রিয় ' নতুনকুঁড়ি ' অনুষ্ঠানের রূপকারও মুস্তাফা মানোয়ার

শিল্পের নিদর্শন:

মুস্তাফা মানোয়ারের তৈরি নানা শিল্পের নিদর্শন আমাদের ঢাকা শহর তো বটেই, দেশের বাইরে ছড়িয়ে আছে। ২য় ও ৬ষ্ঠ সাফ গেমসের উদ্বোধনী ও সমাপনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ডিরেক্টর ও ভিজুয়ালাইজার ছিলেন তিনি। ২য় সাফ গেমস-এর মাসকট ' মিশুক ', ১০ ফুট উঁচু হরিণ শাবক এবং ৬ষ্ঠ সাফ গেমস এর মাসকট ' অদম্য ' , একটি বড় বাঘরূপী জীবন্ত পাপেট নির্মাণ তাঁর একটি বড় সাফল্য। পরবর্তীতে ' মিশুক '-এর একটি প্রতিরূপ ঢাকার শাহবাগে স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল রঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাও তাঁর পরিকল্পনা।

১৯৮৪ সালে ঢাকার জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে ভারতীয় বাঙালি কবি পূর্ণেন্দু পত্রী একটি কথা বলেছিলেন —‘ একটি দেশের জন্য একজন মুস্তাফা মনোয়ারই যথেষ্ট ’।  কবির কথার পুনরাবৃত্তি করেই লেখাটি শেষ করছি।