মাউন্ট এভারেস্ট কেন মৃত্যুর ফাঁদ

প্রকাশের তারিখ:

এক সময় পর্বতারোহণের চূড়ান্ত স্বপ্ন ছিল মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা। আজ সেটি যেন পর্যটনের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর মতো—তবে পার্থক্য একটাই: এখানে দাঁড়িয়ে থাকলেই প্রাণ যেতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি, গাইড কোম্পানি আর অর্থের জোরে এভারেস্টে ওঠা এখন আর কেবল প্রশিক্ষিত অ্যাথলেটদের একচেটিয়া চ্যালেঞ্জ নয়। কিন্তু ঝুঁকি কমেনি বিন্দুমাত্র। বরং ভিড়, সময়ের সংকীর্ণতা আর উচ্চতার নিষ্ঠুরতা মিলিয়ে বিপদ বেড়েছে বহুগুণ।

১৯৫৩ সালে প্রথম নিশ্চিতভাবে শিখরে পৌঁছেছিলেন এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে। সাত দশক পরও পাহাড়টি ততটাই নির্দয়। প্রশ্ন হলো—কেন এত মৃত্যু? কারণগুলো বহুস্তরীয়।

কেবল পড়ে যাওয়া নয়—মৃত্যুর ধরন বহুমুখী
এভারেস্টের উচ্চতা ২৯ হাজার ফুটের বেশি। পড়ে যাওয়া ভয়ংকর বটে, তবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় তুষারধস ও বরফধসের কারণে। এরপরই আছে অতিরিক্ত ঠান্ডায় জমে যাওয়া, তীব্র উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, হঠাৎ বরফের খণ্ড ভেঙে পড়া, দড়ি দুর্ঘটনা, নিউমোনিয়া—এমনকি বিরল ক্ষেত্রে পানিতে পড়ে যাওয়াও। বিস্ময়করভাবে, শিখরে ওঠার চেয়ে নামার পথে প্রাণহানি বেশি—কারণ তখন শরীর নিঃশেষ, বিচারবোধ ঝাপসা।

ভিড়ের ফাঁদ—শিখরের পথে ট্রাফিক জ্যাম
এভারেস্টে পৌঁছাতেই লাগে প্রায় ১০ দিন। অভিযোজন, প্রস্তুতি মিলিয়ে সময় আরও বাড়ে। খরচও বিপুল। তবু আবহাওয়া ভালো হলে শিখরের পথে শত শত মানুষ একসঙ্গে এগোন। সংকীর্ণ রিজে অপেক্ষার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অনেকের অক্সিজেন ফুরোয়। পার্কের লাইনে দাঁড়ালে বিরক্তি বাড়ে; এভারেস্টে লাইনে দাঁড়ালে জীবনটাই ঝুঁকিতে পড়ে।

অর্থ আছে, অভিজ্ঞতা নেই—বিপদের সূত্রপাত
নেপালের অর্থনীতিতে এভারেস্ট বড় উৎস। পারমিটের সংখ্যা বাড়ায় ভিড় বেড়েছে। কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা বা অভিজ্ঞতার কঠোর মানদণ্ড না থাকায় অনেক অনভিজ্ঞ অভিযাত্রীও উঠে পড়েন। কম খরচের অভিযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা যায়—ফলে ঝুঁকি ছড়িয়ে পড়ে সবার ওপর।

সুযোগের জানালা খুবই ছোট
শীতের ঝড় আর গ্রীষ্মের মৌসুমী বায়ুর মাঝের ক্ষুদ্র সময়টুকুই তুলনামূলক নিরাপদ। সেই জানালায় আবহাওয়া ভালো থাকলে সবাই একসঙ্গে ওঠার চেষ্টা করেন। ফলে ভিড় বাড়ে, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়—আর ‘নীল আকাশের দিন’ই হয়ে ওঠে মৃত্যুঝুঁকির দিন।

‘ডেথ জোন’—২৫ হাজার ফুটের পর শরীর হার মানে
২৫ হাজার ফুট পেরোলেই শরীর কার্যত অক্সিজেন ‘ব্যবহার’ করতে পারে না। ফুসফুসে পানি জমতে পারে, মস্তিষ্কে ফোলা শুরু হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায়। এই শেষ কয়েক হাজার ফুটের অঞ্চলই পরিচিত ‘ডেথ জোন’ নামে। হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, তীব্র উচ্চতাজনিত অসুস্থতা—সবকিছু একসঙ্গে ধেয়ে আসে।

অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে হারানোর ঝুঁকি
ডেথ জোনে একজন মানুষ নিজের যত্নই নিতে হিমশিম খান। তখন বিপন্ন কাউকে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। বাইরে থেকে নিষ্ঠুর মনে হলেও, বাস্তবে অনেক সময় কাউকে ফেলে এগিয়ে যাওয়াই একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়।

‘সামিট ফিভার’—শিখরের নেশা প্রাণঘাতী
শিখরে পৌঁছানোর নেশা মানুষকে অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়। অক্সিজেন কমছে—তবু থামছে না। শরীর ভেঙে পড়ছে—তবু ফেরার কথা ভাবছে না। টাকা, সময়, অহং—সব মিলিয়ে ‘ফিরে যাওয়ার সময়’ পেরিয়ে যায় অনেকে।

পড়েই মৃত্যু—দক্ষতার পরও রেহাই নেই
বরফের ফাঁক পেরোতে ধাতব মই, দড়ি—সব থাকলেও এক মুহূর্তের ভুল প্রাণ নিতে পারে। শিখরে পৌঁছেও ফেরার পথে গভীর খাদে পড়ে মৃত্যু—এভারেস্টে এমন ঘটনা বহু।

পরিচিত মুখ হয়ে থাকা মৃতদেহ
এভারেস্টে পড়ে থাকা কিছু মৃতদেহ পথচিহ্নে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘গ্রিন বুটস’। বহু বছর ধরে শিখরের পথে অভিযাত্রীরা ওই দেহ পাশ কাটিয়ে গেছেন—পাহাড়ে মৃত্যুও কখনো কখনো ‘চিহ্ন’ হয়ে থাকে।

ডেভিড শার্প—৪০ জনের পাশ কাটিয়ে যাওয়া মৃত্যু
ব্রিটিশ পর্বতারোহী ডেভিড শার্প ডেথ জোনে জমে মারা যান। অনেকেই তাঁকে পাশ কাটিয়ে যান—কারণ উদ্ধার করার ক্ষমতা তখন কারও ছিল না। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক উসকে দেয়—এভারেস্টে মানবিকতার সীমা কোথায়?

ভালোবাসায় ফিরে গিয়ে মৃত্যুবরণ
ফ্রান্সিস আর্সেনতিয়েভ শিখরে উঠেছিলেন অক্সিজেন ছাড়াই। নামার পথে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর স্বামী সের্গেই তাঁকে খুঁজতে আবার ওপরে ওঠেন—দুজনেই আর ফেরেননি। এভারেস্টে ভালোবাসাও কখনো কখনো জীবন কেড়ে নেয়।

দুঃসাহসের চূড়ান্ত রূপ
কেউ কেউ ঝুঁকিকে ইচ্ছা করেই বাড়ান। ফরাসি অভিযাত্রী মার্কো সিফ্রেদি এভারেস্ট থেকে স্নোবোর্ডে নামতে গিয়ে নিখোঁজ হন। দুঃসাহস আর বেপরোয়া সাহসিকতার মাঝের রেখা এখানে ভীষণ ক্ষীণ।

উচ্চতায় বিভ্রান্তি—মস্তিষ্কের ওপর আঘাত
উচ্চতায় ‘হাই অল্টিটিউড সেরিব্রাল ইডিমা’ হলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, হাঁটতে কষ্ট হয়, কথা জড়িয়ে যায়। দ্রুত নীচে না নামলে স্থায়ী ক্ষতি বা মৃত্যু ঘটতে পারে।

একদিন শিখরে ওঠা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নয়
শেরপা বাবু চিরি বহুবার শিখরে উঠেছিলেন। তবু এক সাধারণ অভিযানে খাদে পড়ে প্রাণ হারান। এভারেস্টে অতীত সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না।

কাছে যেতেও বিপদ—দূরত্বের নিষ্ঠুরতা
এভারেস্টে পৌঁছানোর পথই কঠিন। গবেষক আলেকজান্ডার কেলাস পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিন বছর পর তাঁর সঙ্গীরা—জর্জ ম্যালরি ও স্যান্ডি আরভিন—শিখর জয়ের চেষ্টায় প্রাণ হারান।

রোগজীবাণুও সঙ্গী হয়ে ওঠে
বেস ক্যাম্পে ভিড় মানে সংক্রমণের ঝুঁকি। ফ্লু, কোভিডের মতো শ্বাসতন্ত্রের রোগ ছড়ায় দ্রুত। পানি দূষণ থেকে ডায়রিয়াও বড় সমস্যা—দূরত্ব ও প্রতিকূলতায় স্বাস্থ্যসেবা সীমিত।

তুষারধস—হঠাৎ নেমে আসা মৃত্যু
বরফের স্তর ভেঙে পড়া বা ‘সেরাক’ ধস অনেক প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের মৌসুমে বড় দুর্ঘটনায় বহু গাইড ও অভিযাত্রীর মৃত্যু হয়—কখনো ভূমিকম্পের ধাক্কায় পুরো মৌসুম বন্ধ হয়ে যায়।

চিকিৎসা আছে, তবে সীমাবদ্ধ
বেস ক্যাম্পে চিকিৎসক থাকলেও সব সরঞ্জাম পৌঁছানো কঠিন। বিদ্যুৎ সৌরনির্ভর, আবহাওয়া খারাপ হলে হেলিকপ্টার নামতে পারে না। প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেককেই নীচে পাঠাতে হয়।

ঝড়—দৃশ্যমানতার মৃত্যু
১৯৯৬ সালের ভয়াবহ ঝড় বহু প্রাণ কেড়ে নেয়—ঘটনাটি পর্বতারোহণ ইতিহাসে দগদগে ক্ষত। খারাপ আবহাওয়া ভিড়ের সঙ্গে মিললে বিপদ বহুগুণ বাড়ে।

মৃত্যুর পরও পাহাড়ে পড়ে থাকা দেহ
এভারেস্টে মৃতদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল। তাই বহু দেহ বরফে জমে থেকে যায়—রঙিন পোশাকে পথচিহ্ন হয়ে ওঠে। বলা হয়, শতাধিক দেহ এখনো পাহাড়ে রয়ে গেছে।

শেষ কথা
এভারেস্ট মানুষকে ডাক দেয়—সীমা ছোঁয়ার ডাক। কিন্তু এই ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে অনেকে ভুলে যান, পাহাড়ের নিয়ম আলাদা। ভিড়, সময়ের চাপ, শরীরের সীমাবদ্ধতা আর শিখরের নেশা—সব মিলিয়ে এভারেস্টে মৃত্যু কোনো একক দুর্ঘটনা নয়; এটি ঝুঁকির ধারাবাহিক ফল।

শিখর জয়ের গল্প যত আকর্ষণীয়ই হোক, এভারেস্ট আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির কাছে মানুষের অহং শেষ পর্যন্ত নতজানু।

রিপ্লাই লিখুন:

আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করে এখানে আপনার নাম লিখুন

শেয়ার করুন:

জনপ্রিয়

এ সম্পর্কিত আরও কিছু পোস্ট
Related

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জিতলে রাশিয়া নিয়ে হিটলারের পরিকল্পনা কী ছিল?

এটি ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে মিত্রবাহিনী যদি দ্বিতীয়...

লটারির ইতিহাসে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সংখ্যা

“যদি আমি লটারির জন্য এই জাদুকরী সংখ্যা বেছে নিই,...

বিমানবন্দর নেই বিশ্বের যে পাঁচ দেশের

একটি স্বাধীন দেশের বিমানবন্দর নেই এমনটা শুনতেও কেমন যেন...

ভুলে আবিষ্কার হয়েছিল এক্স-রে!

ঊনবিংশ শতাব্দীর এক পদার্থবিদ, যিনি পরীক্ষাগারে সামান্য ভুল থেকে...