আইফেল টাওয়ার নিয়ে কিছু কথা

eifel-tower

আইফেল টাওয়ার নিয়ে কিছু কথা

জোবায়ের আহমেদ

 

চিত্রকলার জন্য ফ্রান্সের বেশ সুখ্যাতি আছে, নামকরা অনেক শিল্পীদের জন্ম এখানে। কিন্তু যারা শিল্প বোঝে না, তারাও ফ্রান্সকে চেনে অন্য এক আশ্চর্য স্থাপত্য দিয়ে। তোমরা নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছ যে আমি প্যারিসের আইফেল টাওয়ার-এর কথা বলছি। তোমরা সবাই হয়তো আইফেল টাওয়ার-এর ছবি দেখেছ, অনেকে হয়তো প্যারিসে ঘুরেও এসেছ। প্যারিসে গিয়ে আইফেল টাওয়ার দেখেনি, এমন পর্যটক পাওয়া মুশকিল। কিন্তু যে আইফেল টাওয়ারের কারণে প্যারিসের এতো সুখ্যাতি, সেই টাওয়ারটাই কিনা একসময় ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিল ফ্রেঞ্চরা! এমনই কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য সম্পর্কে আজ আমরা জানব।

১৮৮৯ সালে ফ্রেঞ্চ স্থাপত্যবিদ গুস্তাভ আইফেল এই টাওয়ারটি নির্মাণ করেন ফ্রান্সের সৌন্দর্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। ৩০০ মিটার উঁচু এই লোহার কাঠামোটি তখনকার সময়ের অন্যান্য সব উঁচু উঁচু স্থাপত্যকে যেন হাসির খোরাক বানিয়ে দিয়েছিল। এই টাওয়ার নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য হিসেবে খ্যাতি ছিল আমেরিকার ওয়াশিংটন মনুমেন্ট—এর, এর উচ্চতা ছিল ১৬৯.৩ মিটার। প্রায় দ্বিগুণ উচ্চতার আইফেল টাওয়ার ১২৫ বছর ধরে প্যারিসে রাজত্ব করেছে সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য হিসেবে।

                                                      

এবার আমরা আইফেল টাওয়ারের কিছু অজানা তথ্য নিয়ে আলোচনা করবো। এই টাওয়ারটি নির্মাণ করতে ২ বছর, ২ মাস, ৫ দিন লেগেছিল। নির্মাণের পর থেকে ৪১ বছর ধরে এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থাপত্য হিসেবে আধিপত্য বিরাজ করেছে।

১৯৩০ সালে আমেরিকার ক্রাইসলার বিল্ডিং এর উচ্চতা ছাড়িয়ে গেলেও আইফেল টাওয়ার ফ্রান্সের সর্বোচ্চ স্থাপত্য থাকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত। টাওয়ারটির ওজন ১০,১০০ মেট্রিক টন এবং এতে ওঠার জন্য সিঁড়ির ধাপ রয়েছে ১৬৬৫টি।

সিঁড়ি বেয়ে পুরো টাওয়ারটিতে উঠতে গেলে পায়ের বারোটা বাজবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৮০০০ ছোট ছোট লোহার অংশ থেকে এই পুরো কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে, এবং এই অংশগুলো ২৫ লাখ নাট-বল্টু দিয়ে সংযুক্ত।

মরিচা ধরা থেকে বাঁচানোর জন্য প্রতি ৭ বছর পর পর টাওয়ারটি রং করা হয়, সম্পূর্ণ টাওয়ারটি রং করতে ৬০ মেট্রিক টন রং-এর প্রয়োজন হয়।  ২৫ জন রংমিস্ত্রী ১৫০০টি ব্রাশ নিয়ে পুরো টাওয়ারটি রং করতে সময় লাগে ২৫ মাস।

তাহলে একবার চিন্তা কর তো, তোমাকে যদি দেওয়া হত টাওয়ারটি রং করতে, তাহলে কত সময় লাগত! টাওয়ারটিতে চড়ার জন্য সিঁড়ির পাশাপাশি বেশ কয়েকটি লিফটও রয়েছে। এতো উঁচু এই টাওয়ারে লিফট সংযোজন খুব একটা সহজ কাজ ছিল না, টাওয়ারের উচ্চতা আর কাঠামোর সাথে মিল রেখে এখানে লিফট স্থাপন করতে ইঞ্জিনিয়ারদের ঘাম ছুটে গিয়েছিল। মজার ব্যাপার হল, এই টাওয়ারটির লিফটগুলো বছরে যতটুকু দূরত্ব অতিক্রম করে, তা সারা পৃথিবীর আয়তনের প্রায় ২.৫ গুণ।

এবার আসি এই টাওয়ারের ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্তের কাহিনীতে। গুস্তাভ আইফেল এই টাওয়ারটি নির্মাণের পর এর কাঠামো দেখে বিশেষজ্ঞরা মতামত দেন যে এর আয়ু ২০ বছর। অর্থাৎ, ২০ বছর পর এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং শহরবাসীরা চাইলে তখন এটি ভেঙ্গে ফেলতে পারবে। কিন্তু ২০ বছর অপেক্ষা করতে হয়নি, এই আকাশছোঁয়া স্থাপত্যটিকে কোন এক অদ্ভুত কারণে কেউই পছন্দ করতে পারছিল না।

নামকরা সব চিত্রশিল্পী এবং লেখকরা এর বিরুদ্ধে লেখা শুরু করলেন। তাঁরা বললেন যে তাঁরা ভেবেই পাচ্ছেন না যে এমন একটা “কুৎসিত” স্থাপত্য প্যারিসে থাকে কি করে! শহরবাসীদের তোপের মুখে কর্তৃপক্ষ যখন প্রায় সিদ্ধান্ত নিল যে এটি ধংস করে ফেলা হবে, তখনি গুস্তাভ আইফেল একটা বুদ্ধি বের করলেন। তিনি টাওয়ারটিকে আবহাওয়া-গবেষণাগারে পরিণত করলেন। টাওয়ারটি অনেক উঁচু হওয়ার কারণে এর সাহায্যে বাতাসের গতিবেগ এবং আবহাওয়া নির্ণয় সম্ভব ছিল। এভাবে তিনি তাঁর সাধের টাওয়ার রক্ষা করলেন। এখানেই শেষ না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার এই টাওয়ারটি ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন এটি রাখা হয় বেতার তরঙ্গের একটি ভালো পরিবাহক হিসেবে। এমন সব অদ্ভুত কারণে টাওয়ারটি বারবার বেঁচে যায় এবং পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ায়।