আলোর কাছে যাই

পুতুলের পা হাঠাৎ নড়ে ওঠে। মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। কাঁপতে থাকে ঠোঁট। চোখের পাতা খুলে যায়। চোখের পাতায় পলক পড়ে। চুলগুলো উড়তে থাকে বাতাসে। আহ! বাতাস, মিষ্টি বাতাস। চোখের মণিতে বাতাসের ছোঁয়া। বাতাসের ছোঁয়ায় চোখে পানি আসে পুতুলটির।

তবে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে না। পুতুল চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে দেয় না। ধরে রাখে চোখের ভেতর। পুতুলের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তবুও প্রথম পৃথিবী দেখার আনন্দ ধরে রাখে দুই চোখে। মাথার উপরে ফ্যান টিউবলাইটের ঝকঝকে আলো। ড্রেসিং টেবিলের স্বচ্ছ কাচ। কাচে নিজেকে অবিকল দেখা যায়।

পুতুল অবাক হয় নিজেকে দেখে। ঘাড়টা একটু ডানদিকে ঘুরালেই একটি টেলিভিশন। টেলিভিশনে ছবি দেখা যাচ্ছে। রঙবেরঙের ছবি। কতো যে রঙ দেওয়া আছে সেই ছবিতে! দেখতে ভীষণ ভালো লাগে পুতুলটির। হঠাৎ সব রঙ মুছে যায়। চারদিকে অন্ধকার।

ঘুটঘুটে অন্ধকারে চোখ ব্যথা করে পুতুলটির। নিজেকে তখন বড় বেশি হালকা মনে হয়। মনে হয় শরীরের একটুও ভার নেই। যেন এক টুকরা কাগজ। অনায়াসেই ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। বাতাসের সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে পাখির মতো। বাতাসে ভেসে যাচ্ছে মেঘের মতো। বাতাসে ভেসে যাচ্ছে উড়োজাহাজের মতো।

পুতুলটি মেঘের মতো ভেসে যেতে চায়। পাখির মতো উড়ে যেতে চায়। কিন্তু চারদিকে এতোই অন্ধকার যে কিছুই দেখতে পায় না। তবুও সে সাহস করে সামনে পা বাড়ায়। এক পা। এক পায়ে ভর দিয়ে পুতুলটি ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে নামে। আহ! কী ঠাণ্ডা মেঝে। বারকয়েক কেঁপে ওঠে পুতুলের শরীর।

তারপরও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে এগোতে থাকে। সামনের দরজা খোলা। খোলা আকাশ। খোলা মাঠ। মাঠের ওপারে উঁচু একটি স্তম্ভ। স্তম্ভটির চূড়ায় টিমটিম করে আলো জ্বলছে। আর সব দিকে অন্ধকার। পুতুল ওই আলোর খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। ভাবে-চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেবল উঁচু ওই স্থানে আলো জ্বলছে। কীসের আলো ওটা?

আলোর খোঁজে বেরিয়ে পড়ে পুতুলটি। যেতে যেতে দেখা হয় একটি জোনাকি পোকার সঙ্গে। পোকাটির গায়েও এমন মিটমিট করে আলো জ্বলছে। পুতুলটি দেখে ভীষণ অবাক হয়। বলে, তোমার নাম কী? তোমার গায়ে এত্তো আলো!

তোমার ওই আলোয় আমাকে একটু পথ দেখাবে? আমি এখনই উঁচু ওই আলোর কাছে যেতে চাই। দেখতে চাই ওঠা কীসের আলো। জোনাক পোকা বলে, তুমি কে? এই রাতে ওখানে কেনই বা যেতে চাইছো? আমি আজই প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছি। আলোর রঙ দেখেছি। আলো আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। তাই যেতে চাইছি দূরে ওই আলোর দিকে। বলে পুতুলটি।

এই কথা শুনে জোনাক পোকা খুব কাছাছি আসে। বলে ঠিক আছে চলো। আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে ওই আলোর কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। এই কথা বলেই জোনাক পোকা পুতুলের হাত ধরতে চায়। কিন্তু হাত খুঁজে পায় না। বলে, তোমার হাত কোথায়? কোথায় তোমার হাতে আঙুল? পুতুল বলে, নেই। আমার একটি হাত নেই। শুধু তাই নয়। আমার একটি পাও নেই।

জোনাক পোকা পুতুলের কথা শুনে অবাক হয়। পুতুলের আরো কাছাকাছি আসে। তার আলো দিয়ে পুতুলকে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করে। সত্যিই তো এক হাত ও এক পা ওয়ালা একটি পুতুল। অদ্ভুত এই পুতুলটির বাম হত নেই। ডান পা নেই। কী আর করা!

বিস্ময় চোখে জোনাক পোকা পুতুলের ডান হাত ধরে। বলে, চলো আলোর কাছে যাই। তারা হাঁটতে থাকে। আলোর দিকে হাঁটতে থাকে। আলো থেকে তাদের দূরত্ব কমতে থাকে। দূরের আলোর এখন বেশ কাছাকাছি পুতুল ও জোনাক পোকা। জোনাক পোকা বলে উঁচু এই স্তম্ভের নাম স্মৃতিসৌধ।

এটি আমাদের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য লাখ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। তাদের কথা স্মরণ করেই তৈরি করা হয়েছে এই সৌধটি। পুতুল দেখে সত্যিই অনেক বড়ো একটি স্মৃতিসৌধ। চারপাশে মানুষ।

প্রায় সব মানুষের হাতে ফুল। সৌধের বেদিতে ফুল। পুরো এলাকাটাই যেন ফুলের রাজ্য। এ রাজ্যে সারা জীবন থেকে যেতে পারলেই ভালো হতো। ভাবে পুতুলটি। পুতুলের ভাবনায় ছেদ ঘটায় জোনাক পোকা। বলে, তুমি থাকো। আমি এখন যাই। দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কুয়াশা ভেদ করে আলো বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

এরপর আমার আলোর আর কোনো মূল্যই থাকবে নো। দেখতে দেখতে পুরা এলাকাটাই আলোর বন্যায় ভরে যায়। এতো আলো কখনো দেখেনি পুতুলটি। এতো মানুষও দেখেনি কখনো। শত শত মানুষ আসছে। একেক জন মানুষ একেক রকমের।

তবে একজন মানুষকে দেখে পুতুলটি অবাক হয়। কারণ ওই মানুষটি তার মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। আরেকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে আসছেন স্মৃতিসৌধের দিকে। ক্র্যাচ ভর দিয়ে হাঁটছেন লোকটি। লোকটির একটি হাত নেই। একটি পাও নেই। তবে লোকটির শরীরের অবস্থা তার ঠিক উল্টো। অর্থাৎ পুতুলটির বাম হাত নেই। আর লোকটির ডান হাত নেই।

লোকটিকে দেখে পুতুলের ভীষণ মায়া হয়। পাশ দিয়ে যাওয়ায় সময় পুতুল লোকটিকে ডাকে। বলে, একটু দাঁড়ান। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। এমন শরীরে আপনি আজ এখানে এসেছেন কেন? আপনাকে দেখে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনার মতো আমারও এক হাত এক পা নেই। আপনার কেমন করে এমনটি হলো?

পুতুলের কথা শুনে লোকটি অবাক হয়। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। ভাবেÑ পুতুল এসব কথা জানতে চাচ্ছে কেন? এসব কথা জেনে ওর লাভটাই বা কী? লোকটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এ দেশের স্বাধীনতার জন্য আমি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি।

যুদ্ধের সময় গ্রেনেড হামলায় আমার একটি হাত ও একটি পা উড়ে যায়। তবে প্রাণে বেঁচে যাই আমি। এটা আমার যুদ্ধের ক্ষত। এই ক্ষতর ফসল বাংলা ভাষা। এই ক্ষতর ফসল বাংলাদেশ। এই ক্ষতর ফসল স্মৃতিসৌধ। এ জন্য কষ্ট হলেও আমি প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবসে স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে আসি।

এই কথা শুনে লোকটির জন্য পুতুলটির খুব মায়া হয়। ভীষণ শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছে করে। শত শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে। মুক্তিযোদ্ধার পা ছুঁয়ে সালাম করতে ইচ্ছে করে। মুক্তিযোদ্ধার পা ছুঁয়ে সালাম করে পুতুলটি। বলে, আমারও একটি হাত ও একটি পা নেই। এজন্য আমার অনেক দুঃখ। বাড়ির ছোট্ট বাবুটি একদিন আমাকে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল।

ফলে আমার বাম হাত ও ডান পা ভেঙে যায়। কিন্তু কেউ আমার হাত-পা মেরামত করে দেয়নি। আমি জানি হাত-পা না থাকার কষ্ট। এ জন্য আমি আমার বাম হাত ও ডান পা আপনাকে দিতে চাই। পুতুলের কথায় অবাক হয় লোকটি। বলে, এ তুমি কী বলো?

তোমারও তো একটি হাত একটি পা! আমাকে দিয়ে দিলে তোমার কী হবে? পুতুল বলে, কিছুই হবেন না আমার। আমার চেয়ে আপনার মতো মহান একজন যোদ্ধার ভালোভাবে বেঁচে থাকাটা অনেক বেশি জরুরি। এই কথা শুনে লোকটির চোখ পানিতে ভরে যায়। টলটলে পানি তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে স্মৃতিসৌধের বেদির উপর।

লেখক পরিচিতি: ইমরুল ইউসুফ, সহপরিচালক, বাংলা একাডেমি