অভিনয়ে স্বচ্ছই সেরা

পুরো নাম সাইফ খান স্বচ্ছ। পড়ে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণীতে। বয়স মাত্র ১৩। তবে এ বয়সেই তার হাতে উঠেছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পদক। ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে স্বচ্ছ।

কাজী মোরশেদুল ইসলামের ‘একই বৃত্তে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী হিসেবে পেয়েছে এই স্বীকৃতি। একই বৃত্তে চলচ্চিত্রে কোন চরিত্রে অভিনয় করেছে স্বচ্ছ? এমন প্রশ্নের জবাবে মা শম্পা নিজাম বলেন, ‘স্বচ্ছ নিজেও তো একটি শিশু। চলচ্চিত্রে সে একটি শিশুর ভূমিকাতেই অভিনয় করেছে।’

সিনেমায় বাবা নেই এমন একটি শিশুর চরিত্রে অভিনয় করেছে সে। ছবিতে স্বচ্ছ স্বপ্ন দেখে মায়ের হাত ধরে রেল লাইনে হেঁটে বেড়ানোর। একই বৃত্তে চলচ্চিত্রে সাবলীল অভিনয়ের জন্য জুরি বোর্ড শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য বেছে নেয় তাকে।
এই একটি স্বীকৃতি পুরো পৃথিবী পাল্টে দিয়েছে স্বচ্ছর। পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই স্বচ্ছ সিক্ত হতে থাকে নানাজনের শুভেচ্ছাবার্তায়। বাবা-মা, ভাইবোন, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহপাঠী, স্কুল-কোচিংয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিচালকদের কাছ থেকে বাহবা পেয়েছে সে।

স্বচ্ছ জানায়, ‘আমি অভিনয় করি তা আগে থেকেই অনেকে জানতো। এজন্য হঠাৎ স্কুল কামাই হলে বা ক্লাস নোট দিতে না পারলে স্যাররা আমাকে কিছু বলতেন না। আমার জাতীয় পুরস্কারের খবর শুনে অনেকেই পিঠ চাপড়ে দিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন’।

অথচ স্বচ্ছর এই অর্জন মোটেও সহজ পথ বেয়ে আসেনি। দীর্ঘ এগার বছর ধরে অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তার হাতে এসেছে এই পুরস্কার। মাত্র তিন বছর বয়স থেকে মায়ের হাত ধরে অভিনয়ে অভিষেক ঘটে তার। এরপর ২০০৬ সালে বেইলি প্রিপারেটরি স্কুলের কেজি ওয়ানের ছাত্র থাকাকালীন মোরশেদুল ইসলামের ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ নাটকে ভূতের চরিত্রে অভিনয় করে বেশ পরিচিতি পায় সে। এমনকি ক্লাসের সহপাঠীরাও তখন তার অভিনয় দেখে তাকে ভূতের বাচ্চা সোলায়মান বলে ডাকতো। 

এরপর মোরশেদুল ইসলামের ‘একই বৃত্তে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে এবার জিতে নেয় জাতীয় পুরস্কার। এখন পর্যন্ত চারটি সিনেমায় অভিনয় করেছে স্বচ্ছ। এর মধ্যে রয়েছে কাজী মোরশেদের ‘একই বৃত্তে’, পি এ কাজলের ‘মুক্তি’, বদরুল আনাম সৌদের ‘৭১-এর খন্ড গল্প’ এবং মান্নান হীরার ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’।

এর পাশাপাশি ১৩২টি নাটকে অভিনয় করেছে সাইফ। স্বচ্ছ অভিনয় করেছে আবুল হায়াত, ফজলুর রহমান বাবু, ডা. এনামুল হক, মামুনুর রশীদ, মাসুম আজিজ, তৌকীর আহমেদ, জাহিদ হাসান, সুবর্ণা মুস্তাফা, চিত্রলেখা গুহ, ডলি জহুরের মতো খ্যাতিমান অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে। কাজ করেছে অমিতাভ রেজার নির্দেশনায় গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপনেও।

অথচ স্বচ্ছর বাবা ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন খান মোটেই চাননি তার ছেলে অভিনয়ে আসুক। প্রথম এ নিয়ে যথেষ্ট আপত্তি ছিলো তার। সন্তানের ভবিষ্যৎ তিনি নষ্ট হতে দিতে পারেন না চোখের সামনে, এমন কথাও শুনতে হয়েছে সাইফের মা অভিনয়শিল্পী শম্পা নিজামকে। তবে মা হাল ছেড়ে দেননি। মাত্র তের বছর বয়সে এসেই মায়ের সে ত্যাগের প্রতিদান দিতে পেরে রীতিমতো খুশি সাইফ। একই সঙ্গে খুশি মা শম্পা নিজাম এবং বাবা নিজাম উদ্দিন খানও। এখন বাবাও তাকে নিয়ে গর্ব করেন বলে জানায় স্বচ্ছ।

স্বচ্ছ কেবল অভিনয়েই সেরা নয়। পড়াশোনা এবং খেলাধুলাতেও সে কম যায়না। স্কুলের দৌড় প্রতিযোগিতায় নাকি প্রথম পুরস্কারটা তার নামে আগেই লিখে রাখা হয়। আর পড়াশোনার ব্যাপারেও অভিনয়ের মতো সিরিয়াস সে। পড়ার চাপ থাকলে শুটিংয়ে বই নিয়ে যায়। শট শেষ করেই বই নিয়ে বসে পড়ে।

অভিনয়টা কি কঠিন লাগে তোমার কাছে? চ্যাম্পসের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বচ্ছ জানায়, ক্যামেরা সামনে আছে কী নেই সেটা নাকি তার মাথাতেই থাকে না তখন। ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছর সাবলীলতার পেছনের কারণ জানান মা শম্পা নিজাম। তিনি বলেন, ‘ও এতো অল্প বয়স থেকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ায় যে ক্যামেরাকে খেলনা ভেবেই বড় হয়েছে। ওর শৈশব কেটেছে শুটিং স্পটে।’

পথের পাঁচালি, তারে জমিন পার, ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস-৪ আছে স্বচ্ছর প্রিয় সিনেমার তালিকায়। প্রিয় লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। ভূতের গল্প ভীষণ প্রিয় তার কাছে। বড় হয়ে একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখে এই খুদে অভিনেতা!

ছবি : আলিফ হোসেন রিফাত