আমাদের বীরগাথা

ডিসেম্বর। আমাদের বিজয়ের মাস। বাঙালির গৌরবের মাস। পরাধীনতার শেকল ভেঙে মুক্ত হওয়ার মাস। এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে মুক্তিকামী বাংলার জনগনকে। শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হয়েছে নির্ভীক চিত্তে। স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে অানতে বুকের তাজা রক্তে রাঙাতে হয়েছে মাতৃভূমিকে। বিজয়ের মাসে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানীদের গৌরবগাথার টুকরো কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলাে এ প্রজন্মের পাঠকদের জন্য-

মেজর জেনারেল (অব.) চিত্তরঞ্জন দত্ত, বীর উত্তম (সংক্ষেপে সি.আর. দত্ত) জন্ম গ্রহণ করেন ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি, শিলংয়ে। তার বাবার নাম স্বর্গীয় উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম স্বর্গীয়া লাবণ্যপ্রভা দত্ত। তাদের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের মিরাশিতে। সি. আর দত্ত মেট্রিক পাশ করেন ১৯৪৩ সালে। তার দুই বছর পরে খুলনার দৌলুতপুর কলেজ থেকে আবাসিক ছাত্র হিসেবে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে একই কলেজে বিএসসি পড়া শুরু করেন। সেই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রিক্রুটিং অফিসাররা খুলনায় যান কমিশন্ড র‌্যাঙ্কের প্রার্থীদের নির্বাচন করতে। কলেজের অন্যান্য ছেলেদের সাথে সি. আর. দত্তও এই বাছাই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। সেখানে তিনি প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ঢাকার সিলেকশন বোর্ডের ইন্টারভিউয়ে নির্বাচিত হয়ে তিনি চূড়ান্ত ভাবে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কমিশন্ড র‌্যাঙ্কের জন্য নির্বাচিত হন। এরপর ট্রেনিং-এর জন্য চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানের কাকুলে। ১৯৪৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন পেয়ে চাকরি জীবন শুরু করেন পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশভাগের পরে তার পোস্টিং হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঢাকাস্থ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সে রাইফেলে। ১৯৭১ সালে মে মাসের শেষভাগে ৪ নম্বর সেক্টর গঠন করা হয়। মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্তকে এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার তাকে ‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল’ পদে পদোন্নতি দেন। রণাঙ্গণে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্যান্য সেক্টর কমান্ডারের মতো তিনিও ‘বীর উত্তম’ পদকে ভূষিত হন।
……………………………………..

কানাইঘাটের সীমান্তের অপর পাশের পাহাড়ে ইন্ডিয়ান আর্মি অবস্থান নিয়েছিল। তাদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করা যায় আমি সেই সুযোগ খুঁজছিলাম। আমার ভাগ্য ভালো, দেখি একদিন একটা তরুণ ছেলে আমার কাছে কাছে ঘুরঘুর করছে। ওকে দেখে আমার সন্দেহ হলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় অপরিচিত কাউকে দেখলেই মনে সন্দেহ জাগতো। কারণ কে বন্ধু আর কেইবা শত্রু তা চিনতে সমস্যা হতো।

ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কে? এখানে কী চাও?’ ছেলেটি বলে, ‘স্যার, আমার নাম হামিদ’। নাম ‘হামিদ’ বলাতে আমার আরো সন্দেহ হল। ছেলেটি বলল, ‘আমি ইন্ডিয়ান আর্মির লোক। আমাকে পাঠানো হয়েছে, যুদ্ধে আপনার যদি কোন সাহায্যের প্রয়োজন হয় সেটা আমাকে বললে আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেব। আমরা আপনাকে সাহায্য করবো।’ আমি বললাম, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

প্রথমেই ছেলেটির কথাকে অতটা বিশ্বাস করতে পারি নাই। কিন্তু পরে আবার মেজর রবের একটা কথা মনে পড়ল। তিনি আমাকে জানিয়ে ছিলেন, ‘দত্ত, তোমার যা দরকার তুমি সাহায্য পাবে। তোমার কাছে লোক আসবে।’ সেই কথা মনে পড়ায় হামিদের কথাটাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো। আমি ওকে বললাম ‘হ্যাঁ আমার সাহায্যের দরকার। কানাইরঘাটের ওদিকে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর যে জায়গায় পাকিস্তানিরা আর্মিরা আছে সেটা দখল করতে না পারলে আমি আর এগিয়ে যেতে পারছি না। সিলেটও জয় করতে পারছি না।

তাই এই জায়গাগুলোতে আর্টিলারি ফায়ারের প্রয়োজন। যাতে ওরা আমার উপর কোন আক্রমণ করতে না পারে।’ হামিদ বলল, ‘আমরা আপনাকে সাহায্য করবো।’ তখন ছেলেটি গিয়ে নিজের সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে আমাদের অপারেশনের সময় কোথায় কোথায় আর্টিলারি ফায়ারের প্রয়োজন সেটা জানাল। আমাদের অ্যাটাকের সঙ্গে সঙ্গে এই অপারেশনে সময় ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাকে খুব ভালো আর্টিলারি সাপোর্ট দিয়েছিল।

আমাদের এই দ্বিমুখী আক্রমণে পাকিস্তানিরা কুশিয়ারা নদীতে টিকতে পারল না। আমি জায়গাটা দখল করে ফেলি। ওখানে প্রায় ১০/১১ জন পাকিস্তানি মারা গেল। দূর থেকে অত ভালো বোঝা যায় না। তবে যতটুকু আমার মনে হয়েছিল, কুশিয়ারা নদী একদম রক্তে ভরে গিয়েছিল। বাকি পাকিস্তানিরা উইথড্র করে চলে গেল। ওখানে আমার বোধহয় একজন না দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন। আর দুজন বোধহয় আহত হয়েছিলেন। আমি ওদেরকে পেছনে পাঠিয়ে দিলাম।

৪ নম্বর সেক্টর ট্রুপস ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর অগ্রসর হলো কানাইরঘাটের দিকে। লে. গিয়াসের নেতৃত্বে একটি কোম্পানিকে দরবস্ত-কানাইরঘাট রাস্তার মধ্যে ‘কাট-অফ’ কোম্পানি হিসেবে কাজ করার দায়িত্ব দেয়া হলো। লে. গিয়াসের দায়িত্ব ছিল কোন শত্রু সৈন্য যেন দরবস্ত থেকে এসে আমাদের কানাইঘাটে বাধা প্রদান না করতে পারে। অন্যদিকে লে. জহিরকে একটি কোম্পানিসহ কানাইঘাট-চুরখাই সড়কের দায়িত্ব দেয়া হলো। যাতে চুরখাই দিয়ে কোন শত্রু সৈন্য পালিয়ে যেতে না পারে। আর মেজর রবের নেতৃত্বে দুইটি কোম্পানির দায়িত্ব ছিল নদীর পাড় ও মাঝ দিয়ে শত্রুর ওপর হামলা চালিয়ে কানাইঘাট জয় করার।

রাতের আধাঁরে শুরু হলো আমাদের অভিযান। রাত দেড়টায় গোলাগুলি শুরু হলো। খবর নিয়ে জানলাম লে. গিয়াসের সঙ্গে দরবস্ত-কানাইঘাট এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাগুলি হচ্ছে। লে. গিয়াসের কোম্পানি পাকিস্তানি বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে। আমার কাছে ওয়াকিটকি সেট ছিল। সেটা দিয়েই আমি বিভিন্ন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে থাকি। কিছুক্ষণ পর খবর এল ওই কোম্পানির একটি ছেলে শহীদ হয়েছে।

তবে লে. গিয়াস লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়ে চলেছে। ওদিকে লে. জহিরের কাছ থেকে খবর এল তখন পর্যন্ত তারা তাদের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে পারে নাই। কারণ শত্রুরা তাদের গতিরোধ করার জন্য এলএমজি’র গুলি ছুড়ছে এবং মর্টারের সাহায্যে গোলা নিক্ষেপ করছে। তবে মেজর রবের যাত্রাপথে কোন গোলাগুলি হচ্ছিল না। তারা এগিয়ে চলছিলেন।

৪ ডিসেম্বর রাত আড়াইটায় চারদিক থেকে তুমুল যুদ্ধের খবর আসতে শুরু করে। লেঃ গিয়াসের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। আরো খবর পেলাম, তারা যাওয়ার পথে পাঞ্জাবিদের চারটি বাংকার ধ্বংস করেছেন। তখন বাংকারের ভেতর থেকে কারা যেন চিৎকার করে বলে ওঠে ‘আমরা বাঙালি। আমাদের মারবেন না। আমরা আপনাদের সাহায্য করব। দুইটি পাঞ্জাবি পালিয়ে যাচ্ছে, আপনারা ওদের আক্রমণ করুন।’ এই পাকিস্তানিদেরকেও লে. গিয়াসের কোম্পানি মেরে ফেলে।

রাত সাড়ে ৩টায় লে. গিয়াসের কাছ থেকে খবর পেলাম, তাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তা সে পূরণ করেছে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। চারদিক থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসছিল। ভোর ৪টায় লে. জহিরের কাছ থেকে জানলাম, কানাইঘাট-চুরখাইয়ের পথে প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে সে অগ্রসর হতে পারছে না। তাছাড়া তার কোম্পানির দুইজন মুক্তিযোদ্ধা গুরুতর আহত হয়েছে। আমি তাকে বললাম আহত ব্যক্তিদেরকে পেছনে পাঠিয়ে দিতে। একইসাথে নির্দেশ দিলাম সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কারণ যেভাবেই হোক পাকিস্তানিদের প্রতিহত করতেই হবে।

মেজর রবের কাছ থেকে জানলাম, তারা ওখানে প্রচ- গোলাগুলি উপেক্ষা করে এগিয়ে চলছেন। তার কোম্পানি নদীর পাড়ি দিয়ে শত্রুদের ঘিরে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। শত্রুদের কাছ থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে আছেন। এদিকে কোম্পানির পাঁচটি ছেলে আহত হয়েছে বলে তাদেরকে পেছনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আর কোম্পানির জন্য অবিলম্বে গোলাবারুদ পাঠানো দরকার। তখন গোলাবারুদ পাঠানো হলো। সকাল ৬টা দিকে লেঃ জহিরের কাছ থেকে জানতে পারলাম শত্রুদের মেশিনগান ও মর্টারের গোলা ভীষণভাবে তাদের উপর এসে পড়ছে। ফলে তারা তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করতে পারছে না।

নদীর ওপারে বেশ দূরে আটগ্রামে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট সঙ্গে বেতার যোগাযোগ ছিল না। আমরা কানাইঘাট আক্রমণ করছি- বেঙ্গল রেজিমেন্ট সে খবর জানত কিনা আমি জানি না। তাছাড়া আমরা জানতাম, নদীর দুই পাড়েই পাকিস্তানি সেনা আছে। কানাইঘাটের নদীর ওপারে শত্রুসৈন্য ও প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্ট মুখোমুখি বসে আছে জানলাম। ওদের ওপর শত্রুসৈন্য হটিয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তারা কোনভাবেই সেই কাজ করতে পারছিল না।

তাই পেছনের দিক থেকে কানাইঘাট দখল করা খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। কারণ জানি আমরা কানাইঘাট দখল করলে নদীর ওপারে পাকিস্তানিদের থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। লে. জহির যখন এগুতে পারছিল না এবং মেজর রবের যখন আরো সেনা দরকার তখন লে. জহিরকে বললাম মেজর রবের সেনাদের সাহায্য করতে। যাতে তারা কানাইঘাটের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ হানতে পারে।

ভারতের আর্টিলারি আটগ্রামের পাশে বড় একটা টিলার ওপর অবস্থান করছিল। আামকে বলা হয়েছিল ওদের সাহায্য চাইলে পাওয়া যাবে। খবর পাঠালাম, কানাইঘাট বাজারের ওপর এবং নদীর ওপারে আঘাত হানতে। খুবই সুন্দরভাবে সাহায্য আসতে লাগল।

সকাল প্রায় ৯টার দিকে পাকিস্তানি অবস্থান থেকে গোলাগুলির মাত্রা দারুণভাবে বেড়ে গেল। কিন্তু ২০ মিনিট পর বন্ধ হয়ে গেল। বুঝলাম, পাকিস্তানিরা হেরে গেছে। মেজর রব ও লে. জহিরকে বললাম, ‘এগিয়ে চল। আজ আমাদের কানাইঘাট দখল করতেই হবে।’ লে. গিয়াসকে আগেই খবর পাঠিয়েছিলাম তাই সে ওর দুই প্লাটুন সৈন্য দিয়ে লে. জহিরকে সাহায্য করার জন্য কানাইঘাট-চুরখাই রাস্তায় অবরোধ গড়ে তুলতে। সকাল প্রায় ১০টায় খবর পেলাম, নদীর ওপার থেকে পাকিস্তানিরা পালাচ্ছে।

হুকুম দিলাম, ‘ঝাঁপিয়ে পড়ো।’ হাতাহাতি যুদ্ধের খবর পেলাম কিছুক্ষণ পরেই। বিপুল বিক্রমে মেজর রব, লে. জহির ও লে. গিয়াসের সেনারা কানাইঘাটে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাকিস্তানিরা দিশাহারা হয়ে পড়েছিল। ওরা সাঁতার জানত না, তবুও নদীতে ঝাঁপ দিতে আরম্ভ করল প্রাণ বাঁচানোর জন্য। নদীর পাড়ে ওরাই মাইন পুঁতেছিল। তাই নদীর পাড় দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় নিজেদের মাইনের বিস্ফোরণে মারা যাচ্ছিল।

৪ ডিসেম্বর, সকাল ১১টার সময় কানাইঘাট আমাদের দখলে চলে এল। চারধার থেকে শুধুই আসছিল ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। শুধু দেখছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের হাসি মুখ। পেছনে খবর পাঠালাম কানাইঘাট জয়ের কথা। নানা জায়গা থেকে আমাকে অভিনন্দন জানানো হলো।

কানাইঘাট যুদ্ধে নিহত পাকিস্তানি সৈন্যের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০। আহত ২০ জনকে গুলি করে মারা হয়। বাঙালি রাজাকার ছিল ২০ জন। তারা আমাদের পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়ায় ওদের ক্ষমা করে দিলাম। আমাদের পক্ষের শহীদ হয়েছিলেন ১১জন আর আহতদের সংখ্যা ছিল ১৫। আহতদের চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

উল্লেখ্য লে. গিয়াস ‘মেজর’ হিসেবে ১৯৮১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে অংশ নেয়ার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত হন। লে. জহির বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। ‘বীর প্রতীক’ উপাধিপ্রাপ্ত।

সূত্র : '৭১ বীরত্ব বীরগাথা বিজয়'- বইয়ের প্রথম খণ্ড থেকে সংগৃহীত