আমাদের বীরগাথা

ডিসেম্বর। আমাদের বিজয়ের মাস। বাঙালির গৌরবের মাস। পরাধীনতার শেকল ভেঙে মুক্ত হওয়ার মাস। এই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে মুক্তিকামী বাংলার জনগনকে। শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হয়েছে নির্ভীক চিত্তে। স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে অানতে বুকের তাজা রক্তে রাঙাতে হয়েছে মাতৃভূমিকে। বিজয়ের মাসে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানীদের গৌরবগাথার টুকরো কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলাে এ প্রজন্মের পাঠকদের জন্য-

ClassTune

মরহুম তোফাজ্জেল হোসেন খান ও মরহুমা রোকেয়া খানমের সন্তান বীরপ্রতীক লে. কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান ১২ নভেম্বর ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন।  তার জন্মস্থান ঢাকা বিভাগের মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে সেকেন্ড টার্মের প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। সেখান থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পালিয়ে এসে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে যোগ দেন। বীরযোদ্ধা মোদাসসের হোসেন খান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ‘সোর্ড অব অনার’ প্রাপ্ত সেনা অফিসার।
………………………………………………..

‘ভোর হওয়ার পর থেকে আমাদের যারা আহত হয়েছেন তাদের ফেরত নিয়ে আসতে থাকলাম। যুদ্ধের নিয়ম হলো, কাউকে পেছনে ফেলে আসতে হয় না। প্রাণ দিয়ে হলেও আহত অথবা মৃত অবস্থায় তাদের বডি নিয়ে আসতে হয়। আমরা মোটামুটি সবাইকে ফেরত নিয়ে চলে আসছি।

আমি অক্ষত অবস্থায় ছিলাম। যখন চলে আসবো তখনকার একটা দুঃসাহসিক ঘটনা রয়েছে যা আমি কখনো ভুলবো না। এটি মেজর আমিনুল হকের দুঃসাহসিকতার গল্প। এরকম দুঃসাহসী কমান্ডিং অফিসার অত্যন্ত বিরল। উনি নিজের প্রাণের এতোটুকু ভয় করতেন না। অত্যন্ত সাহসী একজন যোদ্ধা ছিলেন।

কমান্ডিং অফিসার হওয়া সত্ত্বেও তিনি সবসময় সামনেই থাকতেন। সৈনিকরা সবসময় তার পেছনে থাকতো। আমরা সকালবেলা যখন চলে আসছি তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘মোদাসসের, দেখো তো আর কারো বডি-কেউ আহত বা নিহত আছে কিনা’। আমি বাইনোকুলার দিয়ে খুঁজে দেখছি, ‘নাই’।

হঠাৎ করে দেখলাম দূরে কালো কী যেন একটা নড়ছে। আমার মনে হলো, এখানে নিশ্চয়ই একজন কেউ আছে। আমি বললাম, ‘না স্যার, কেউ আছে তো মনে হয়’। তারপর দেখলাম, কেউ একজন হাত একবার উঠাচ্ছে আর নাড়াচ্ছে, বেশ দূরে। আমরা যেখানে ছিলাম সেখান থেকে প্রায় পাঁচ/ছয়শ গজ দূরে হবে।

তার কাছেই পাকিস্তান বাহিনীর বর্ডার আউট পোস্ট। মেজর আমিনুল হক বললেন, ‘আহত হোক বা যেই হোক আমাদের তাকে আনতে হবে’। আমি মেজর আমিনুলকে বললাম, ‘স্যার, আপনি এখানে থাকেন। আপনি পেছন থেকে ফায়ার দেন’। হাবিলদার তাহেরও তখন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনিও খুব সাহসী যোদ্ধা। 

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনারা দুজন এখানে থাকেন। আমি গিয়ে নিয়ে আসি’। মেজর আমিনুল বললেন, ‘না আমি যাবো। তুমি যেতে পারবে না। তুমি এখানে থাকো’।

আমাদের মধ্যে অনেকক্ষণ বাগবিতণ্ডা হয়। কারণ কমান্ডিং অফিসার হলেন খুব সিনিয়র অফিসার। তার কোনো ক্ষতি হলে ব্যাটালিয়নের ক্ষতি হবে। কিন্তু তিনি আমাকে কিছুতেই যেতে দিলেন না। বললেন, ‘তুমি থাকো’। আমি বললাম, ‘তাহলে দুজন যাই’।

কিন্তু আমাদের দুজনকে রেখে তিনি একাই গেলেন। বললেন, ‘তোমরা দুজন থাকো’। এরপর প্রায় পাঁচ/ছয়শ গজ ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে তিনি ক্রলিং করে গিয়ে দেখেন, মেজর আমিন আহমেদ চৌধুরী পায়ে গুলি লেগে আহত অবস্থায় পড়ে আছেন।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ার কারণে তার শরীর প্রায় নিস্তেজ হয়ে আছে। ইতোমধ্যে আমরা দেখলাম, আমাদের আরো কয়েকজন আহত হয়ে পাকিস্তান পোস্টের কাছাকাছি পড়েছিলেন, যাদের আমরা তখনো আনতে পারিনি তাদের পাকিস্তান আর্মির লোকজনরা এসে গুলি করে মেরে ফেললো।

কারণ পাকিস্তানিরা আহত অবস্থায় আমাদের কাউকে রাখতে চায়নি। বুঝতে পারলাম, জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীকে ওরা মেরে ফেলবে। কিন্তু মেজর আমিনুল হক (বীরউত্তম) একাই আবার আমিন আহমেদ চৌধুরীকে হাতের মধ্যে নিয়ে ব্যাকক্রলিং করে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে নিয়ে আসতে থাকলেন।

আমরা পেছন থেকে ফায়ারিং কভার দিচ্ছিলাম। এভাবে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেদিন ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হক। একজন কমান্ডিং অফিসার নিজের প্রাণের কোনো পরোয়া না করে নিজে এতোদূরে গিয়ে আরেকজন অফিসারকে নিয়ে আসলেন, এটা আমি কখনো ভুলবো না।

নকসী বিওপির যুদ্ধ ছিল আমার প্রথম সম্মুখযুদ্ধ। এই যুদ্ধের কমান্ডার ছিলেন মেজর আমিনুল হক। কোম্পানির ইনচার্জ ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী।

আমি ছিলাম তার সেকেন্ড ইন কমান্ড। মেজর আমিন আহমেদ চৌধুরী ৭১-এর ৩ আগস্ট নকসী বিওপিতে পাকিস্তান বাহিনীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। রাত ১২টার দিকে এসেম্বলি এরিয়া (যেখান থেকে অপারেশন সম্পর্কে শেষ ধারণা দেয়া হয়) থেকে রওনা হবার পরিকল্পনা করা হয়।

তার আগে মেজর আমিন আহমেদ চৌধুরী তিন দিন ধরে রেকি করে শত্রুর সংখ্যা, তাদের অবস্থান, তাদের অস্ত্র সম্পর্কে ধারণা নিয়েছিলেন। এসেম্বলি এরিয়া থেকে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে সৈন্যরা FUP বা Forming Up Place (যুদ্ধক্ষেত্রের আগে যেখানে সৈন্যরা সমবেত হন) এ পৌঁছায়।

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এফইউপি ১ হাজার গজ দূরে ছিল। পূর্ববর্তী দুই রাত পানির ওপর দিয়ে চলার প্র্যাকটিস করায় তারা নালাও নিঃশব্দে পার হয়ে যায়। অন্যদিকে একই সময়ে দুই প্লাটুন সৈন্য রাঙটিয়াতে কাট-আপ পার্টি হিসেবে ছিল।

রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে সৈন্যদল এফইউপি-তে অবস্থান নেয়। তারপর মেজর আমিন আহমেদ চৌধুরীর নির্দেশে আর্টিলারি গর্জে ওঠে। তখনই বিপত্তি দেখা দিলো, কারণ আর্টিলারি মুক্তিবাহিনীর এফইউপি-তে এসে পড়তে থাকে।

এতে যেমন অনেকে আহত হন তেমনি স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাকি সৈন্যরা ভয় পেয়ে যায়। ঠিক সে সময়ই পাকিস্তানিদের আর্টিলারি থেকে গোলাবর্ষণ শুরু হলো। মুক্তিযোদ্ধাদের মেশিনগান ও আর আর (রিকয়েললেস রাইফেল) তার প্রত্যুত্তর দিতে গর্জে ওঠে। তারপর তারা এফইউপি ছেড়ে প্রবল প্রতাপে সামনে এগুতে থাকেন।

শুরু হয় হাতাহাতি যুদ্ধ। কিন্তু ঠিক সে সময়েই শত্রুর আর্টিলারির শেলভো ফায়ার (এয়ার বাস্ট) এসে পড়লো মুক্তিসেনাদের ওপর। এতে অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আর বাকি সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ধরতে গেলে তখনই নকসী বিওপি যুদ্ধের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।

সব যুদ্ধেই সফলতা ও ব্যর্থতা দুটোই আছে। সামান্য ভুলের কারণে পুরো আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যায়। ‘নকসী বিওপির  যুদ্ধে ব্যর্থতার দুটি কারণ ছিল। একটা হলো, আমরা আগের রাতে রেকোনেইসেন্স (সংক্ষেপে যাকে রেকি বলা হয়) করে অর্থাৎ ওখানকার শত্রুপক্ষের অবস্থান কী রকম আছে, লোকজন কতো আছে, কোনখানে মাইন আছে, কোনখানে মেশিনগান আছে ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে যে তথ্য এনেছিলাম পরের দিন সেখানে অনেক পরিবর্তন হয়ে যায়।

পাকিস্তানিরাও আমাদের অপারেশন সম্পর্কে টের পেয়ে গিয়েছিল। ফলে এই নকসী বিওপিতে ওদের লোকবল ও মেশিনগান অনেক বাড়িয়ে দেয়।

আরেকটা কারণ ছিল, (যেটা দুর্ভাগ্যবশত শুধু আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধেই নয়, অনেক যুদ্ধেই এটা হয়েছে) এই যুদ্ধে যেসব স্থানে মিত্রবাহিনীর (ইন্ডিয়ান আর্মি) সাহায্য দেয়ার কথা ছিল সেখানে তারা ঠিক সময়ে সেটা দেয়নি।

এ অপারেশনটায় আমরা আক্রমণে যাওয়ার আগে পেছন থেকে মিত্রবাহিনীর সাপোর্টিং আর্টিলারি ফায়ার করে আমাদের ব্যাকআপ দেয়ার কথা ছিল। সেটা সময়মতো ও পর্যাপ্ত হারে তারা দিতে পারেনি।

ফলে পাকিস্তান বাহিনী যেভাবে পজিশন নিয়েছে সেই পজিশনে থেকেই যুদ্ধ করতে পেরেছে এবং আমাদের বেশি ক্ষতি করতে পেরেছে। যে কারণে আমাদের সাফল্য আসেনি। নকসী বিওপিতে আমাদের বড় একটা অপারেশন ছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা সফল হতে পারিনি।

ওখানে আমাদের মধ্য থেকে সব মিলিয়ে ৫৮ জন আহত এবং শহীদ ও নিখোঁজ হন ১২ জন।’ স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এদের প্রত্যেকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

(সূত্র : ‘৭১ বীরত্ব বীরগাথা বিজয়’- বইয়ের প্রথম খণ্ড থেকে সংগৃহীত)