হঠাৎ আবিষ্কার!

দৈনন্দিন জীবনে আমরা কতো কীই না ব্যবহার করি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কত রকমের জিনিস যে কাজে লাগে তার হিসেব বের করা মুশকিল। এসব নিত্য ব্যবহার্য সব জিনিসই যে দীর্ঘ গবেষনার পর আবিষ্কার হয়েছে তা কিন্তু নয়।

এর মাঝে অনেক জিনিস আছে যেগুলো নেহায়েত হঠাৎ করেই আবিষ্কার হয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডিসকভারি’। বাংলায় বলা চলে 'আকস্মিক আবিষ্কার'। তেমনি কিছু আবিষ্কারের গল্প জেনে নেয়া যাক-

টুথপেস্ট
সকালবেলা ব্রাশ হাতে নিয়ে টুথপেস্ট টিউবের পেট টিপে যদি পেস্ট না পাওয়া যায় তখন মেজাজটা বিগড়ে যাওয়া খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু কী করে এই টুথপেস্ট আমাদের ঘরে এলো। টুথপেস্ট আবিষ্কারের হাজার বছর আগে চীন, মিশর ও ভারতে প্রথম দাঁত যত্নের চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। এসময় মানুষ গাছের বাকল, লবন ও ফুলের পাপড়ি মিশিয়ে এক ধরনের মিশ্রণ তৈরি করতো।

এরপর পারস্যের 'জিরইয়াব' নামক এক ব্যক্তি নতুন ধরনের দাঁতের মাজন তৈরি করেন। এটা ছিলো পরিশোধিত ও সুগন্ধযুক্ত। তারপর নানা হাত ঘুরে অাধুনিকতার ছােঁয়া পেয়ে আজকের মাজন বা পেস্ট চলে আসে আমাদের ঘরে।

ব্রাশ
সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজার জন্য আমরা যে আধুনিক ঝকঝকে রং বেরঙের ব্রাশ ব্যবহার করি তার আবিষ্কারের গল্পটাও বেশ মজার। ১৭৭০ সালে দুষ্কর্মের অভিযোগে ইংল্যান্ডের উইলিয়াম অ্যাডিস নামের এক ব্যক্তিকে জেলে যেতে হয়। সে সময় জেলের ভেতর মোটা কাপড় দিয়ে দাঁত মাজতে হতো। ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগত না তার। তিনি চিন্তা ভাবনা করে বের করেন চমৎকার এক বুদ্ধি।

খাবার শেষে পড়ে থাকা একটি হাড়ের এক দিকটায় বেশ কিছু ফুটো করে জেলের সেপাইদের কাছ থেকে চেয়ে নেন ঘোড়ার লেজের কিছু চুল। তারপর কায়দা করে ফুটো গলিয়ে চুল গুলো বেঁধে দিয়ে তৈরি করেন ব্রাশ। এরপর জেল থেকে বেরিয়ে আরো সুন্দর করে বানালেন ব্রাশ। খুলে বসেন মস্ত একটি কারখানা। এটাই আধুনিক ব্রাশের বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার গল্প।

কলম কাহিনী
কলম ছাড়া কি একদিনও আমাদের চলে। এখন হয়তো মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে কলম ছাড়া অনেক কিছুই লেখা রাখা যায়। তবুও এখনো কলমের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। প্রথম কলম আবিষ্কারের পেটেন্ট নেন রোমানিয়ার 'পেত্রাশ পোনারু'।

সেটা ১৮২৭ সালের কথা। এসময় পোনারুকে প্রচুর নোট নিতে হতো। তাই সহজে এবং দ্রুত কোনো কিছু লেখার তাড়না থেকেই পোনারু আবিষ্কার করেন ফাউন্টেন পেন।

আর আজ আমরা যে বলপেন ব্যবহার করি তার আবিষ্কারের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। জন লাউড নামের একজন মার্কিনি তার চামড়ার ব্যবসার জন্য চামড়ার উপর লেখার বলপেন আবিষ্কার করেন। কিন্তু এটা দিয়ে চামড়ায় লেখা গেলেও কাগজের উপর লেখা যেতো না।

এর প্রায় ৫০ বছর পর হাঙ্গেরির একজন সাংবাদিক তরল কালির পরিবর্তে কলমে ছাপাখানার শুকনো কালি ভরে দেন। তারপর কলমের নিবের মাথায় বসিয়ে দিলেন ছোট্ট একটি ঘুরন্ত বল। যাতে কালির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ব্যস, বিশ্ব পেয়ে গেল সহজে লেখার জন্য আধুনিক বলপয়েন্ট।   

পেন্সিল
বিশ্বজুড়ে পেন্সিলের ব্যবহার শুরু হয় ১৫৬৫ সালের পর থেকে। ধারণা করা হয় ইংল্যান্ডের বরোডেলে প্রচুর পরিমাণ গ্রাফাইট পাওয়া যায়। ওখানকার মেষ পালকেরা দেখলেন এই গ্রাফাইট দিয়ে ভেড়ার গায়ে দাগ দিলে তা সহজে উঠে যাচ্ছে না। এরপর থেকে আস্তে আস্তে গ্রাফাইটের ব্যবহার শুরু। কিন্তু বার বার ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে এটি কাঠের সঙ্গে বেধে ব্যবহার করা হতো। তারপর বিবর্তিত হয়ে আজকের পেন্সিলের রুপ পেয়েছে।

সেফটি পিন
আমেরিকার ওয়াল্টার হান্ট সেফটি পিনের জনক। কিন্তু নেহাত ধার পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করে ফেলেন আজকের বহুল ব্যবহৃত সেফটি পিন। তার এক বন্ধুর কাছ থেকে ১৫ ডলার ধার নিয়েছিলেন তিনি। সেই ধার পরিশোধ করার জন্য কিছু একটা আবিষ্কারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

এ সময় একটি পিতলের তার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে এদিক সেদিক করে আজকের সেফটি পিনের আকারে রুপ দিলেন। ১৮৪৯ সালের এপ্রিল মাসে সেফটি পিনের পেটেন্ট ৪০০ ডলারে বিক্রি করে তারপরই বন্ধুর ধার শোধ করেছিলেন হান্ট।  

ভেলক্রো
নামটা একটু অচেনা লাগলেও ভেলক্রোর সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। আমাদের জুতা বা ব্যাগ পড়ার সময় কাপড়ের একটি অংশ আরেকটি অংশের উপর রেখে একটু চাপ দিলেই লেগে যায়। আবার একটু টান দিলেই পচ শব্দ করে খুলে যায়। এই জিনিসটার নামই ভেলক্রো। এর আবিষ্কারক জর্জ ডে মেস্ত্রাল নামের এক সুইস একজন প্রকোশলী।

তিনি একবার তার পোষা কুকুর নিয়ে আল্পস পাহাড়ের কাছের জঙ্গলে বেড়াতে যান। ফিরে এসে লক্ষ্য করেন তার জামা ও কুকুরের গায়ে প্রচুর বারডক গাছের বীজ লেগে আছে।

তিনি বীজগুলো সরাতে গিয়ে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে নিয়ে দেখেন তাতে হাজার হাজার হুক জাতীয় পদার্থ লেগে আছে। যা সহজেই কাপড়ে আটকে যায়। এরপর সিন্থেটিক কাপড় দিয়ে জর্জ বানিয়ে ফেললেন জিনিস পত্র খোলা বন্ধের এক চমৎকার উপায় 'ভেলক্রো'।

কফি
কফি আবিষ্কারের গল্পটা আরো চমকপ্রদ। ইথিওপিয়ার কালদি নামের এক মেষ পালক। ছাগল চরাতে গিয়ে একদিন লক্ষ্য করেন অন্য দিনের তুলনায় তার ছাগলগুলো রীতিমতো উত্তেজিত, বলা যায় দাপাদাপি করছে।

এর কারণ খুজতে গিয়ে কালদি এক রকম বুনো ফল খুঁজে পান। যেটা খেয়ে ছাগলের এই অবস্থা। তারপর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এই বুনো ফলের কথা। সেই ফলই আজকের কফি বিন।

তবে এর আরেকজন আবিষ্কর্তা মনে করা হয় ইয়েমেনের শেখ ওমর নামের নির্বাসিত এক ব্যক্তিকে। বনের মধ্যে ক্ষুধায় যখন তার মরমর অবস্থা তখন তিনি এই বুনো ফল চোখে দেখেন এবং খেয়ে ফেলেন। তারপর তো তিনি রীতিমতো ফিট।

চুইংগাম
চুইংগামের সঙ্গে আমাদের পরিচয় নেই এমন দাবী খুব কম মানুষই করতে পারবে। চলতি পথে, খেলার মাঠে চুইংগাম আমাদের পরিচিত সঙ্গি। এর আবিষ্কারক আমেরিকার টমাস অ্যাডামস। সাপোডিলা গাছের আঠা জাতীয় নির্যাস জমাট করে রাবার বানানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি।

অনেক চেষ্টা চরিত্রের পর কিছুই যখন দাঁড়া করাতে পারছিলেন না তখন অন্যমনস্ক হয়ে সেটা মুখে পুড়ে ফেলেন। তারপর দেখলেন আরে এতো মন্দ লাগছে না। আবার ফুরুচ্ছেও না সহজে। এরপর তাতে নানা সুস্বাদু উপকরণ মিশিয়ে চুইংগামের এক বিশাল কারখানাই খুলে বসেন।