হিন্দি-বাংলা টিভি সিরিয়াল : দেখছি আমরা শিখছে কে

আকাশ সংষ্কৃতির যুগে বিনোদনের মাধ্যম সীমান্তের সীমারেখা পেরিয়েছে অনেক আগেই। বোকাবাক্স জুড়ে এখন চ্যানেলের ছড়াছড়ি। টিভি চ্যানলেগুলোর অনুষ্ঠান তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে সোপ অপেরাগুলো। চটকদার কাহিনীচিত্র বাহারি সাজপোশাকের কারণে মেগাসিরয়িালগুলো পরিণত হয়েছে ঘরোয়া বিনোদনের অন্যতম উৎসে।

ClassTune

আমাদের প্রতিদিনের পছন্দের অনুষ্ঠানের তালিকায় ওপারের হিন্দি-বাংলা টিভি সিরিয়ালগুলোর জয়জয়কার। সন্ধ্যেটা নেমে এলেই আশপাশের বাসাবাড়ি থেকে ভেসে আসে একের পর এক বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালগুলোর জিঙ্গেলের সুর। কোন বাসা থকে হয়তো ভেসে আসছে টিভি সিরিয়াল রাশির শুরুর সঙ্গীতের প্রথম কলি আবার তার পাশের বাসা থেকেই থেকেই ভেসে আসছে হিন্দি সিরিয়াল 'দিয়া অর বাতি হাম'-এর মিউজিক।

সিরয়িালগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। জটিল পারিবারিক সমস্যা নিয়ে তৈরি সিরিয়ালগুলো দেখে তো আমরা নির্মল আনন্দ উপভোগ করছি কিন্ত আমাদের পরিবারের ক্ষুদে দর্শকদের কী অবস্থা? অনেকেই ভ্রু কুঁচকে বলতে পারেন, কেনো টিভি সিরিয়ালগুলোতে সমস্যা কোথায়! এগুলোতে তো আপত্তিকর কোন দৃশ্যই দেখানো হয় না। সোজা চোখে দেখলে আপনাদের কথাই ঠিক। কিন্তু ঘটনাটি কী আসলেই তাই?

চলুন আগে জেনে নেই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কি বলছেন। আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মুস্তাবশিরা জানান, 'এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলো অনেকক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই উপযোগী না। শিশুদের জন্য তো কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অনুষ্ঠানগুলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অনেক খারাপ প্রভাব ফেলে।

কেননা আমরা সাধারণত শিশুদের মিথ্যা না বলা, ঝগড়া না করা ইত্যাদি শেখাই, কিন্তু এই সব অনুষ্ঠানগুলোতে বেশিরভাগ সময় এই বিষয়গুলো দেখানো হয়। ফলে শিশুরা মানসিক টানাপোড়েনে ভোগে। সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না যে কোনটি ঠিক? সে যা দেখছে তা ঠিক নাকি যা তাকে শেখানো হচ্ছে তা ঠিক?'

তিনি আরো বলেন, 'American academy of pediatric-এর মতে, ২ বছরের নীচের শিশুদের দিনে ১ ঘণ্টার বেশি এবং ২ বছরের ওপরের শিশুদের দিনে ২ ঘণ্টার বেশি টেলিভিশন দেখতে দেয়া ক্ষতিকর।'

এছাড়াও এসব অনুষ্ঠানে পারবিারিক সর্ম্পকের যে জটিল এবং কুটিল দিকগুলো দেখানো হয়, তা তার মনে গেঁথে যায়। ফলে সে নিজের পরিবারের নানা সদস্যদরে সর্ম্পকেও নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতে শুরু করে। যেমন : অধকিাংশ টিভি সিরয়িালেই বউ-শ্বাশুড়ি বা ভাবীদের মাঝে যে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বিছানোর চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয় তা দেখে একটি শিশু ধারণা করে নিতেই পারে তার মা-দাদীর সর্ম্পকটাও বোধহয় এরকমই।  

শহরের মতো ঢাকার বাইরের শিশুদের উপরেও পড়েছে টিভি সিরিয়ালগুলাের প্রভাব। এ বিষয়ে কথা হয় রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার আরকান্দি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ নাইমা ফেরদৌস শান্তার সাথে। তিনি জানান, 'গ্রামের শিশুদের ওপরও এই ধরনের সিরিয়ালগুলোর খারাপ প্রভাব পড়ছে। দেখা যায়, অনেক শিশু একে অপরের সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছে। এমনকি কে কার চেয়ে ভালো হিন্দি বলতে পারে সেই প্রতিযোগিতাও হচ্ছে।'

পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে ডাঃ নাইমা আরো বলেন, 'অনেক মা অভিযোগ করেন যে তাদের বাচ্চারা বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকে বা সহজে ঘুমায় না। দেখা যায় মায়েরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে এই সকল সিরিয়াল দেখেন ফলে শিশুরাও এতে অভ্যস্ত হয়ে পরে। আর তাই তাদের ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন ঘটে যা সহজে দূর হয় না। ফলে তারা সকালে উঠে স্কুলে যেতে চায়  না। আর বাচ্চাদের পরিপূর্ণ ঘুম না হবার ফলে মানসিক বিকাশে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে।'

টিভি সিরয়িালগুলো দেখা না দেখা প্রসঙ্গটিকে একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক ও বিতার্কিক ডাঃ আব্দুন নূর তুষার। তার মতে, 'শিশুরা পরিবারের বড়দের দেখে বেশি প্রভাবিত হয়। দেখা যায়, ঈদের সময় যখন এই সব সিরিয়ালের নামে বিভিন্ন পোশাক বাজারে আসে তখন পরিবারের বড় সদস্যরা বা মা-বাবারা এই পোশাকগুলো কেনেন। ফলে শিশুরাও এই বিষয়গুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়। তখন তাদের কাছে বাস্তবতার এই জীবনের থেকে টেলিভিশনে দেখানো জাঁকজমকপূর্ণ জীবন বেশি ভালো লাগে।

তারা সেই সংস্কৃতির সঙ্গে বেশি জড়িয়ে পড়ে। তারা নিজের ভাষা না শিখে হিন্দি ভাষা শেখা শুরু করে। ভাষা হল একটি সংস্কৃতির মূল হাতিয়ার। শিশুরা যখন ভাষা শিখে ফেলে তখন সেই সংস্কৃতির অন্যান্য বিষয় গুলোর সাথে খুব সহজেই তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যেমন-খাবার, পোশাক, বিনোদনের বিভিন্ন মাধ্যম। তাই তার মতে শিশুদের এসব থেকে দূরে রাখতে পরিবারের বড়দের ভুমিকাই মুখ্য।'

সবইতো জানলেন এবার ভেবে দেখার কর্তব্য কিন্তু আপনার।