বৈচিত্র্যময় কিছু জনগোষ্ঠীর কথাঃ রেড ইন্ডিয়ান

red-indian

আদিবাসী, গোত্র বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলতে এমন এক ধরণের জাতিকে বোঝায় যারা কোন রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি কিন্তু রয়েছে তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, আচার, রীতি ইত্যাদি। সমগ্র পৃথিবী জুড়েই বিভিন্ন দেশে-মহাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে এরকম অসংখ্য গোত্র বা জনগোষ্ঠী। নিজেদের সংস্কৃতি আর রীতিনীতি দিয়ে এরা একটা দেশের সমাজব্যবস্থাকে করে তোলে আরও বৈচিত্রময়। এরকম কিছু জনগোষ্ঠী নিয়েই এই আয়োজন। এই পর্ব আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে।

সিনেমা, বই আর আমেরিকার ইতিহাসের কল্যাণে রেড ইন্ডিয়ানদের কথা হয়তো আমরা সবাই কম বেশি জানি। রোদে পোড়া তামাটে চামড়া আর মাথায় পাখির পালক লাগানো এই বুনো মানুষগুলোই মূলত আমেরিকার আদি অধিবাসী। বর্তমান আমেরিকান যারা ইউরোপ, আফ্রিকা বা এশিয়া থেকে এসেছে তাদের বহু আগে থেকেই এই অঞ্চলে বাস করছে রেড ইন্ডিয়ানরা।

ClassTune

‘রেড ইন্ডিয়ান’ নামটি বর্তমানে শুধু মুখে মুখেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খাতা কলমে এদের বলা হয় ‘ন্যাটিভ আমেরিকান’ বা ‘আমেরিকার আদি অধিবাসী’। কিন্তু কি কারণে এদেরকে ‘ইন্ডিয়ান’ বলে ডাকা হয় সেটা সবার কাছেই একটা সাধারণ প্রশ্ন। আর এর কাহিনীটাও বেশ মজার।

প্রকৃতপক্ষে ভুলটা করেছিলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস যিনি আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন। স্পেনের রাণীর আদেশে তিনি জাহাজ নিয়ে যাত্রা করেন ভারতবর্ষ যাবার জলপথ আবিষ্কার করতে। ১৪৯২ সালে তিনি প্রথম যেখানে পা ফেলেন সেটি এখনকার বাহামা দ্বীপপুঞ্জ। কিন্তু কলম্বাস জানতেন না যে তিনি নতুন একটি মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলেছেন। বরং তিনি ভেবেছিলেন তিনি ইন্ডিয়া চলে এসেছেন এবং একারণেই এখানকার অধিবাসীদের তিনি ইন্ডিয়ান বলে নামকরণ করেন। একই কারণে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপগুলোকেও একত্রে বলা হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

রেড ইন্ডিয়ানদের মতে তারা সৃষ্টির শুরু থেকেই আমেরিকার এই ভূমিতে বাস করে আসছে। তবে অনেকের মতে প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন বেরিং প্রণালী সৃষ্টি হয়নি অর্থাৎ আলাস্কা আর রাশিয়া সংযুক্ত অবস্থায় ছিল তখন তারা সাইবেরিয়া বা এশিয়ার কোন অঞ্চল থেকে আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছেছে।

আমেরিকা আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত রেড ইন্ডিয়ানরা বেশ সুখেই ছিল। এই অঞ্চলে তারা শান্তিপূর্ণভাবেই শিকার করতো, জীবনধারণ করতো। কিন্তু ইউরোপিয়ানরা এসেই ইন্ডিয়ানদেরকে অবৈধভাবে তাদের ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত করা শুরু করলো, জমি দখল এবং তাদের গৃহপালিত পশু কেড়ে নেয়া শুরু করলো। একের পর এক যুদ্ধ হতে থাকলো। ইউরোপিয়ানদের উন্নত যুদ্ধ কৌশলের কাছে জীবন দিতে হল বহু ইন্ডিয়ানকে। বাধ্য হয়ে পশ্চিম দিকে সরে যেতে থাকে তারা। অনেক সংগ্রাম আর চুক্তির পর বর্তমানে তারা নিজেদের জমিতে বসবাস করার সুযোগ পাচ্ছে। কয়েকশ বছর আগেও যে পরিমাণ সংখ্যা ছিল রেড ইন্ডিয়ানদের এখন তার তুলনায় খুবই কম। কিন্তু তারপরও তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বেঁচে আছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে আছে।

red-indian-2

রেড ইন্ডিয়ানরা মূলত শিকার করে এবং মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এদের চোখের দৃষ্টি এবং ঘ্রাণশক্তি খুব প্রবল। এরা খুব সহজেই প্রাণীর গতিবিধি বের করতে পারে। ইন্ডিয়ানরা ঘোড়া চালনায় রীতিমত অদ্বিতীয়। এদের উৎপাদন করা ঘোড়াগুলোও বেশ শক্তিশালী, দ্রুতগামী এবং সুন্দর হয়ে থাকে। তীর-ধনুক চালনাতেও এরা দারুণ পারদর্শী। শিকারের ক্ষেত্রে তাই এরা এদের দৃষ্টিশক্তি আর তীর-ধনুকই বেশি ব্যবহার করে থাকে।

প্রকৃতির সাথে রেড ইন্ডিয়ানদের এক অস্বাভাবিক আত্মিক সংযোগ দেখা যায়। তারা উদ্ভিদ থেকে তাদের ওষুধ তৈরি করে। গাছের ছাল, বাকল, ডাল, পাতা এসব তারা নানাভাবে ব্যবহার করে থাকে। পশুপাখির চামড়া, হাড়, দাঁত এসবও তাদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। মূলত পোশাক এবং অলংকার হিসেবেই এগুলো ব্যবহার করে তারা। রেড ইন্ডিয়ানদের বিশ্বাস এসবের মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে তাদের এক ঐক্য গড়ে উঠে।

রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে অনেকগুলো গোত্র দেখা যায়। অ্যাপাচি, ব্ল্যাকফুট, চেরোকি, কোমাঞ্চে, কয়োটে, হাভাসুপাই, আইওয়া, রামোনা হচ্ছে এরকমই কয়েকটি গোত্র। পুরো তালিকা দেখুন এখানে।

আমেরিকার ২৮টি রাজ্যের নামকরণ করা হয়েছে রেড ইন্ডিয়ান ভাষা অনুসারে। অ্যালাবামা, আলাস্কা, অ্যারিজোনা, ম্যাসাসেচুতস, টেক্সাস, ইউটাহ এরকম কয়েকটি রাজ্য। পুরো তালিকা দেখুন এখানে।

রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক বই, তৈরি করা হয়েছে বহু চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র। Dances with Wolves, The Last of the Mohicans, Coyote Waits, Into the West, The Lone Ranger হচ্ছে রেড ইন্ডিয়ানদের নিয়ে নির্মিত কিছু সিনেমা যেগুলোর মধ্যে ফুটে উঠেছে তাদের জীবন সংগ্রাম আর করুণ ইতিহাস। Bury My Heart At The Wounded Knee, Winter in the Blood, Ledfeather  হচ্ছে রেড ইন্ডিয়ানদের উপজীব্য করে লেখা কিছু বই।